তথ্যপ্রযুক্তি

মার্চ ২, ২০১৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ন

বিতর্কে বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধন

নিজস্ব প্রতিনিধি

গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় সিম নিবন্ধন কার্যক্রম। শুরুর দিকে এ পদ্ধতি ব্যাপক সাড়া ফেললেও সম্প্রতি এটি নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।



বায়োমেট্রিক্স পদ্ধতিতে সিম যাচাই করতে মোবাইল ফোন কোম্পানির কাছে আঙুলের ছাপ দেওয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে এ পদ্ধতি নিয়ে শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এ পদ্ধতির বিরোধিতা করছেন অনেকে।



১৩ কোটির বেশি সিম নিবন্ধনের আনুষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই শুরু হয় ১৬ ডিসেম্বর থেকে। সময় নির্ধারিত করা হয় আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত। ইতিমধ্যে আড়াই মাস অতিবাহিত হয়েছে। বিটিআরসির পক্ষ থেকে নেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আড়াই মাসে প্রায় দুই কোটি মানুষ বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম যাচাই করে নিয়েছেন। আরো দুই মাসের মধ্যে অর্থাৎ আগামী এপ্রিলের মধ্যেই এভাবে আরো ১১ কোটির বেশি সিম নিবন্ধন করতে হবে।



কেউ কেউ বিষয়টিকে স্বাগত জানালেও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে নানা বিতর্ক দেখা দিয়েছে। অনেকে সরাসরি এ পদ্ধতির বিরোধিতা করছেন এবং এ পদ্ধতিটি সঠিক নয় বলেও মত দেন তারা।



দৈনিক বাংলা মোড়ে গ্রামীণফোন কাস্টমার কেয়ার থেকে সিম নিবন্ধন শেষে বের হন রিয়াদুল ইসলাম জনি। তিনি বলেন, এ পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন সত্যিই অনেক ভালো। এটি সরকারের বৃহৎ উদ্যাগ বলা যেতে পারে।



আরেক গ্রাহক জোনায়েদ বলেন, এ পদ্ধতির মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতা কমে যাবে। দেশে জঙ্গিদের দমনে এটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশা করেন। এ ছাড়া অপরাধ প্রবণতাও কমবে।



অন্যদিকে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার স্বার্থে আঙুলের ছাপ দিয়ে সিম নিবন্ধনের বিরোধিতা করতে দেখা যাচ্ছে। নিজস্ব ফেসবুক টাইমলাইন, গ্রুপ, ব্লগ, এমনকি অনলাইন সংবাদপত্রে মতামত লিখে উদ্বেগ জানাচ্ছেন অনেকে।



বহুজাতিক কোম্পানির কাছে আঙুলের ছাপ দেওয়ার ঘোরবিরোধী একজন মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, ‘আমাদের মোবাইল টেলিকম কোম্পানিগুলো বিদেশি। এদের মাধ্যমে হাতের আঙুলের ছাপ বিদেশ চলে যেতে পারে এবং আমি আমার আঙুলের ছাপ বাইরে দিব না- এমন সচেতনতা আমাদের অনেকের মাঝে গড়ে ওঠেনি।’



ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসাদ জানান, পৃথিবীর প্রথম প্রথম দেশ হিসেবে পাকিস্তান ২০১৩ সালে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম রেজিস্ট্রেশন করেছে। তার পর থেকে সারা বিশ্ব যখনই কোনো সন্ত্রাসী বা জঙ্গি ধরা পড়ে, সেখানেই পাকিস্তানিদের আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়। বর্তমান পৃথিবীর তথ্য প্রযুক্তিতে সর্বোচ্চ উন্নত জাতি ইউরোপ-আমেরিকানরা জাতীয় নিরাপত্তার ভয়ে যে সাহস করেনি, আমরা কেন এমন ভুল করতে যাব?’



রাশেদুল ইসলাম জানান, ‘আমি কোনোভাবেই চাইব না যে, আমার হাতের আঙুলের ছাপ সজ্ঞানে আমি একটি বেসরকারি কোম্পানির কাছে দিই। কোনো কর্মকর্তার উপস্থিতিতে বা তার ডিভাইসে আঙুলের ছাপ দিই। কারণ এই আঙ্গুলের ছাপ নানাভাবেই ব্যবহার হতে পারে।’



খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, আঙুলের ছাপ দিয়ে মোবাইল সিম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে প্রথমে পাকিস্তান। বাংলাদেশে এ পদ্ধতিতে দ্বিতীয়। সম্প্রতি সৌদি আরবেও এ নিয়ম চালুর খবর পাওয়া গেছে।’



ব্যক্তিগত গোপানীয়তা এবং স্পর্শকাতর এসব তথ্যের নিরাপত্তার কারণে পশ্চিমা রাষ্ট্র এবং সেখানকার নাগরিক অধিকার কর্মীরা সোচ্চার। কিন্তু বাংলাদেশে নাগরিক অধিকারের স্পর্শকাতর এসব দিক অনেকটা উপেক্ষিত আছে বলে মনে করেন আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক।



সম্প্রতি এক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সংবিধানে যেটা বলা আছে, আমার ব্যক্তিগত সবকিছুর গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার আছে। তবে সরকার দেশের স্বার্থে আইন করে এর ব্যতিক্রম করতে পারে। তো এখানে তো কোনো আইন নাই। আর আমাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না বলে আমরাও আঙুলের ছাপ দিয়ে যাচ্ছি। আমি বলব, চিন্তা করেন। পরে হকার বা বাসে উঠতে বা দুধ কিনতে গেলে যদি ফিঙ্গার প্রিন্ট দিতে হয়, তখন কিন্তু আমরা ব্যাপারটা বুঝতে পারব যে- এটা কতটা উদ্ভট কাজ হচ্ছে।’



টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তিবিদ জাকারিয়া স্বপন বলেন, এ জাতীয় তথ্য রাষ্ট্র ছাড়া কারো কাছে থাকাই নিরাপদ নয়। রাষ্ট্র শুধু এটা প্রটেক্ট করতে পারে বা স্টোর করতে পারে। ওই ডেটাবেজ যদি কেউ পেয়ে যায়, তাহলে তো ডেফিনেটলি ক্রাইম। এনশিওর করতে হবে যে, গর্ভমেন্ট ছাড়া আর কেউ কোনো পাবলিক ইনফরমেশন স্টোর করছে না। কোনো অপারেটর বা যারা এর মধ্যে কাজ করছে, ইভেন মিডলে যারা আছে। কারণ এই ফিঙ্গার প্রিন্টের প্রসেসটা কিন্তু থার্ড পার্টিরা ইমপ্লিমেন্ট করে দিয়েছে।’



তিনি বলেন, আঙুলের ছাপ তৃতীয় পক্ষের কাছে চলে গেলে নানা রকম অপব্যবহার হতে পারে। রিস্কটা হলো- অন্য একটা পার্সন আমাকে ইমপার্সনেট করতে পারে, সে প্রিটেন্ড করতে পারে যে, আমি জাকারিয়া স্বপন। আমার অনুমতি ছাড়াই করতে পারে। বেসিক্যালি আমার যত জায়গায় ডিজিটাল ইনফরমেশন আছে, স্টোর করা আছে- সব অ্যাকাউন্ট চাইলে সে নিয়ে নিতে পারে। এ রিস্ক কিন্তু শুধু আমার-আপনার নয়, সবার ক্ষেত্রে হতে পারে। ইভেন একজন কৃষকেরও হতে পারে। দেখা যাবে, উনি লোন নিয়ে বসে আছেন, অথচ উনি জানেনই না।’



উদ্বেগ এবং বিতর্কের সূত্র ধরে বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে কথা হয় রবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইকরাম কবিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা শুরুতে দুই আঙুলের ছাপ নিয়েছি। পরবর্তীতে দেখা যায়, বয়স্ক লোকদের আঙুলের ছাপ মিলে না। যার কারণে আমরা বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে দুটি ছাপ এবং তর্জনী আঙুলি দিয়ে দুটি ছাপ নিচ্ছি।’



তিনি আরো বলেন, ‘আমরা বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে যেসব তথ্য নিয়ে থাকি সেগুলোর মধ্যে শুধু রেজিস্ট্রেশন ফর্ম ছাড়া আর কোনো কিছুই আমাদের কাছে থাকে না। এসব নির্বাচন কমিশনে চলে যায়। সেখানে থেকে আমাদেরকে শুধু হ্যাঁ অথবা না জানানো হয়। আর সব তথ্যই তাদের কাছে জমা থাকে।’



বাংলালিংকের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা শিহাব আহমাদ বলেন, ‘গ্রাহকদের কাছ থেকে যে তথ্যগুলো আসে, সব তথ্যই এখানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত এটা ভেরিফাইকরা না হচ্ছে। ভেরিফাই হওয়ার পরে বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী এগুলো হয় সংরক্ষণ করা হবে অথবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে ডিলিট করে দেওয়া হবে।’



তিনি বলেন, ‘সংরক্ষণ না করে ভেরিফাই করা সম্ভব না। গ্রাহকদের সম্পূর্ণ তথ্য পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষণ করা হয় এবং সেটা প্রটেকশন দেওয়া হয়। আমাদের সার্ভার থেকে এটা বাইরে যাবার কোনো সম্ভাবনা নেই।’



এ বিষয়ে বিটিআরসির সচিব গোলাম সরোয়ার বলেন, ‘কোনোভাবেই গ্রাহকের তথ্য কোনো টেলিকম কোম্পানি সংরক্ষণ করতে পারবে না। তারা একটি ফর্ম পূরণ করায় সেটি তাদের অভ্যন্তরীণ। কিন্তু রিটেইলার লেভেলে সংরক্ষণ করার কোনো সুযোগই রাখা হয়নি। টেকনিক্যালি ফিঙ্গার প্রিন্ট সংরক্ষণ করা সম্ভব না। কারণ এটা রিয়েলটাইম মিলিয়ে দেখা হয়। তবে অপারেটর লেভেলে এটা সম্ভব হতে পারে যদি আলাদা করে কেউ করে। কিন্তু এ বিষয়ে তাদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যদি কেউ এমন করে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



এদিকে আঙুলের ছাপ বিতর্ক নিয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট তারানা হালিম তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, জাতীয় পরিচয়পত্রে যে ছাপ রয়েছে, সেই ছাপের সঙ্গেই বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে আঙুলের ছাপটা মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। আর জাতীয় পরিচয়পত্রে দেওয়া সেই আঙুলের ছাপটি মিললেই একটি সবুজ কালির টিক চিহ্ন দিয়ে সিমটি নিবন্ধন সম্পন্ন করা হচ্ছে এবং নামে সিমটি নিবন্ধিত হয়ে যাচ্ছে। এখানে মোবাইল অপারেটরগুলোর কাছে দেওয়া আঙুলের ছাপগুলো জমা হচ্ছে না এবং তাদের কাছে এই ছাপগুলো জমা রাখার কোনো প্রযুক্তিও নাই।