ধর্ম

মার্চ ২, ২০১৬, ৪:৫৭ অপরাহ্ন

মদিনা মসজিদে নববীতে দেয়া গত জুমার খুৎবা

ফ.ই.ম ফরহাদ, ব্যুরোচীফ সৌদি আরব (পশ্চিম)

মদিনাঃ গত ২৬/০২/২০১৬ শুক্রবার মদিনার মসজিদে নব্বীতে পবিত্র জুমুয়ার খুৎবা প্রদান করেন মসজিদে নব্বীর ইমাম ড.শায়খ আব্দুল বারি সুবাইতি। তাঁর দেয়া খুৎবার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা হল।

মানব জীবনের লক্ষ্য ও কর্তব্যঃ

আলহামদুলিল্লাহ সকল প্রশংসা মহান প্রতিপালক আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এবং দুরুদ সালাম তার প্রেরিত রাসুল(সঃ) মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ এর উপর এবং তার সকল সাহাবীদের উপর। হে মুসলিমগন! আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার বিধান প্রতিষ্ঠা, অনুপম সৃষ্টির বিস্ময়, তাঁর সৃষ্টির রহস্যরাজি, তাঁর প্রজ্ঞার অনন্যতা তার মহিমান্বিত কুদরত ও তাঁর বিধানের কল্যাণধারা প্রকাশ করতে পৃথিবীতে মানুষকে খলিফার দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো আল্লাহর এক অপার মহিমা এবং মহান প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। যিনি প্রতিটি বস্তুকে সৃষ্টির আকৃতি দান করেছেন এবং কি ভাবে পথ চলবে তা শিখিয়েছেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ক্ষমতা ও তার স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং তাঁর জ্ঞানের বিশালত্ব বোঝাতে মানুষ হল তার বড় এক নিদর্শন। এর চেয়ে বড় আর কোনো নিদর্শন নেই। যাকে তিনি সর্বোত্তম সৃষ্টির জীব হিসেবে সম্মনিত করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টির ক্ষেত্রে তার অনুগ্রহ ও নীতির পদ্ধতি হলো তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের পছন্দ হয় তাদের পৃথিবীর কর্তত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান। ‘পৃথিবীর সকল ক্ষমতা আল্লাহ পাকের। এবং তার প্রিয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ভালবাসেন যাকে ইচ্ছা করেন তাকেই কেবল মাত্র তিনি এর উত্তরাধিকারী করেন।’ (সূরা আরাফ : ১২৮)।

দুনিয়াতে খলিফা নির্ধারন করা এবং খলিফা হিসেবে নির্বাচিত হওয়া একটি পরীক্ষা মাত্র। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন আরও বলেন ‘তোমাদের মহান প্রভু তোমাদের শত্রুকে ধ্বংস করে তোমাদের পৃথিবীতে খলিফা হিসেবে প্রেরন করবেন অতপর লক্ষ্য করবেন তোমাদের কর্মের কেমন ফল হয়!’ (সূরা আরাফ : ১২৯)। তোমাদের মধ্যে যারা সঠিক ও সুন্দর ভাবে তাকওয়ার সাথে প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করে দেখাতে পারবে তারাই পৃথিবীর খলিফা নির্বাচিত হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘আমি জাবুরে (যা দাউদ আঃ উপর নাযিল হয়েছিল) আলোচনার পর ফয়সালা বা নির্ধারন করে দিয়েছি যে, আমার উপযুক্ত বা নেককার বান্দারাই পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে।(সূরা আম্বিয়া : ১০৫)। দুনিয়ার মধ্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্বাচিত খলিফা হিসেবে মনোনীত থাকতে হলে মুসলমান জাতিকে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব এবং আল্লাহর ইবাদত, সৎকর্ম, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, জ্ঞানার্জনসহ তার দেওয়া সব কর্তব্য যথাযথভাবে পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকতে হবে। মুসলিম জাতি একটি মহান পয়গাম এবং মহান সুসংবাদ ও মহৎ লক্ষ্যে জান্নাতের পথ সুগম করার জন্য বেঁচে থাকে। সে পথে অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সংগ্রাম করে।

বৃহত্তর কল্যাণ বাস্তবায়ন করে এবং তার ছায়ায় নিরাপত্তার আশা করে যায়। সে তার গন্তব্যে যাওয়ার জন্য সর্বদা তার কর্ম নির্ধারন করে। তার মূল জায়গা থেকে তার দ্বীনের পরিচর্যা এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠা করে। অথচ কখনও দেখবে সে সুস্থদেহ ও পূর্ণাঙ্গ গঠন সত্ত্বেও জীবনের লক্ষ্য অর্জনে অস্থির হয়ে থাকে। আশাহীন পথ চলে। এক মাত্র জান্নাতই তার লক্ষ বস্তু। কর্মহীন নির্লিপ্ত থাকে। কোনো পয়গাম নিয়ে বা অর্জিত বিষয় নিয়ে অহংকার বা মিথ্যা গৌরব করে না, তার জন্য একনিষ্ঠ হয় না। ইমাম শাফি (রহ.) বলেন, ‘তুমি যদি নিজেকে সত্য পথে নিয়োজিত না রাখ তাহলে তোমাকে অসৎ পথে জড়িয়ে ফেলবে। কর্মহীনতার উদরেই নানা পঙ্কিলতা জটিলতা জন্ম দেয়।

লক্ষ্যবহন কারী ব্যক্তি প্রথমে নিজের জীবনে শুদ্ধি ও জবাবদিহিতা করে। একজন মুত্তাকী ব্যাক্তির মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য তার নিজের লাভের দিকে সম্প্রসারিত হয়ে অন্যকে সংশোধনের দিকে ধাবিত করা। সুদৃঢ় সঙ্কল্প ও মহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে উম্মতের সেবা ও জাতির প্রহরায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে অন্যদেরও সুরক্ষা করা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা মহান বিষয়গুলোকে ভালোবাসেন আর তুচ্ছ বিষয়গুলোকে অপছন্দ করেন।’ দায়িত্বশীল মুসলিম-জীবনের কর্তব্য, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও সত্য বাস্তবায়ন করে তার অধীনস্থদের স্বার্থ ও কল্যাণ নিশ্চিত করে। তাদের পার্থিব জীবনে ও পরকালীন বিষয়ে যা তাদের উপকারে আসবে তা বাস্তবায়নে এবং যা তাদের ক্ষতি করবে তা দমনে সে সর্বাত্মক সচেষ্ট থাকবে। দুর্বৃত্ত ও নির্বোধ লোকদের হাতেনাতে ধরে তাদের অন্যায়, পাপ ও গোলযোগ থেকে নিবৃত্ত করবে।

আলেম সমাজের কাছে দায়িত্ব অনেক বড়। কারণ তারা নবীর ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী। তাদের কর্তব্য,তাদের অর্পিত দায়িত্ব সমাজকে অজ্ঞতার সঙ্কট ও আকিদার ভ্রান্তি থেকে নিজেকে এবং জাতিকে রক্ষা করা। সন্দেহ-সংশয় নিরসন করে তাদের পথ আলোকিত করা। তারা তাদের সঠিক দ্বীন শিক্ষা দেবে। মানুষের মধ্যে যা ভ্রান্তি সৃষ্টি করে আলেমগন তা সংশোধন করবে। সৎকাজের আদেশ দেবে। অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে। বিপদে ধৈর্য ধারন করবে। মুসলিম অভিভাবকদের কর্তব্য, পরিবেশ সুস্থ রেখে, প্রজন্মের লালনপালন ও উন্নত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে মুসলিমের সামনে বিশুদ্ধ নমুনা বাস্তবায়ন করবে। যাতে প্রতিটি মানুষ ধর্ম বর্ণ সকলের নিকট তার বার্তা পৌঁছে যায়। চিন্তাকে প্রসারিত করবে। জীবনের মাঝে জীবনের সঞ্চার করে। অভিভাবকের ব্যবহার হবে আদর্শবান এবং সুন্নত মোতাবেক তার কর্মকান্ড হবে ন্যায়সঙ্গত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ। তার ভূমিকা হবে মহৎ।

মুসলিম নারীর কর্তব্য হল সমাজের কাঠামো ও ভিত্তি রক্ষায় মহত্ত্বকে লালন করা। স্ত্রী ও মা হিসেবে সুস্থ সমাজ গঠন করা। স্ত্রী তার স্বামীর জন্য প্রশান্তি, নিরাপত্তা ও স্বস্তির প্রতীক হবে ঘরকে সে সুখের নীড় ও প্রেম-ভালোবাসার নিভৃত আশ্রয় বানাবে। তার স্নেহ-মায়ায় তাকে পরিচালনা করবে। শিশুদের ইসলামের মৌলিক শিক্ষায় বড় করবে। তাদের নবী-রাসুল ও ইসলামের মহাপুরুষদের গল্প বলবে। তাদের দ্বীনের জ্ঞানে দীক্ষিত করবে। রাসুলদের দেখানো পথ বর্ণনা করবে।

মুসলিম যুবকের কর্তব্য, সে ইসলামের গৌরব করবে। তার ঈমান শক্ত করবে, তার দ্বীনকে বুঝবে, দ্বীনের বিধান অনুসারে চলবে। তার মেধাকে পরিশুদ্ধ করে আত্মশুদ্ধির সাধনা করবে। সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় যত্নবান হবে। সমাজের দোষ ত্রুটি সংশোধন করবে। সমাজ-বাস্তবতা অনুধাবন করবে।

অনুবাদক ও বিশ্লেষক:
মুহা.ওবায়দুল হক, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, সাউদি আরাবিয়া।

নিউজপেজ২৪/ এএ