শিল্প সাহিত্য

মার্চ ১২, ২০১৬, ১২:২৫ অপরাহ্ন

'৫২-র একুশেই মলিন ১১ই মার্চের রাষ্ট্রভাষা দিবস

নিজস্ব প্রতিনিধি

১৯৯৯ সালে ইউনেসকো কর্তৃক ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষিত হলেও প্রথমে ১১ মার্চ-ই ছিল রাষ্ট্রভাষা দিবস।


মুহাম্মদ আলী জিন্নার দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য-নীতির কারণে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষি তথা বাঙালি জনগণের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটতে থাকে।


১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে এর রাষ্ট্রভাষা কি হবে এ নিয়ে জল্পনা কল্পনা শুরু হয।


রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, ড. এনামুল হক, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবুল মনসুর আহমদ, ও অধ্যাপক আবুল কাশেমের মতো মুসলিম পণ্ডিত ও মনীষীদের ক্ষুরধার লেখনী ও তমদ্দুন মজলিশের সাংগঠনিক তৎপরতা শিক্ষিত সচেতন ও সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। তারা উর্দুর সাথে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আন্দোলনের রূপরেখা তেরি করেন। তাদের বুদ্ধিধীপ্ত কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে একটি যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে যায়।


রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উর্দুর সাথে বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব করার মাধ্যমে। তার এই প্রস্তাব তৎকালীন পাকিস্তানী প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় তা নাকচ হয়ে যায়।


প্রতিবাদে '৪৮-এর ১১ মার্চ ধর্মঘট পালিত হয়। সেই ধর্মঘট থেকে ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান, অলী আহাদ, খালেক নেওয়াজসহ অনেকে গ্রেফতার হন এবং আরও অনেকে আহত হয়। '৫২ সাল পর্যন্ত ১১ মার্চ পালিত হতো রাষ্ট্রভাষা দিবস।


পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে শাসকগোষ্ঠী মুসলিম লীগ উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের সচেতন মানুষ ও ছাত্ররা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে কোন সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই পোস্টকার্ড, খাম, রেলওয়ে টিকিট, মানি অর্ডার ফর্মসহ সব সরকারি প্রকাশনায় বাংলাকে বাদ দিয়ে শুধু ইংরেজিতে ও উর্দুতে ছাপায় তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার। এর প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন কুমিল্লার গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। কিন্তু তার সে দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়।


ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক বলেন, গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যখন গণপরিষদে ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে বাংলার প্রস্তাব করেন প্রবল বিরোধিতার মুখে প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকায় যে আন্দোলন হয় তাকে আমরা বলি '৪৮ মার্চের আন্দোলন।


গণপরিষদে বাংলার দাবি প্রত্যাখ্যাত হলে ফুসেঁ ওঠে পূর্ব বাংলা। তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে ছাত্ররা ১১ মার্চে প্রতিবাদী ধর্মঘটের আয়োজন করে এবং এ ধর্মঘটের আহবানে সাঢ়া দেয় সর্বসাধারণ মানুষ। পুলিশ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। এসময় অনেকে আহত হন এবং ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, খালেখ নেওয়াজসহ অনেকে গ্রেফতার হন।


১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত টানা আন্দোলন চলে বাংলায়। ১৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্র খাজা নাজিম উদ্দিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি স্বীকার করে আনেআদালনকারীদের সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হন। সেই আন্দোলনের সূত্র ধরেই গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮-এর ১৯ মার্চ ঢাকা সফরে আসেন।


এ বিষয়ে ভাষা সংগ্রামী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে রাষ্ট্রভাষা পালিত হতো ১১ মার্চ। ( অর্থাৎ, ১৯৪৮, '৪৯, '৫০, '৫১ সালে ১১ মার্চেই পালিত হয়েছিল রাষ্ট্রভাষা দিবস)। কিন্তু ১৯৫২ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি হয়ে গেল রাষ্ট্রভাষা দিবস।


মূলত '৫২-র ২১ শে ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্তের লালিমা স্বমহিমায় ১১ মার্চকে মলিন করে দিয়ে আমাদের স্মৃতিপটে জায়গা করে নেয়। সেই থেকেই সম্মান, আবেগ, অনুভূতি ও ভালবাসায় পরম শ্রদ্ধার সাথে পালিত হয় অমর একুশে ফেব্রুয়ারি।