খোলা কলাম

মার্চ ১৬, ২০১৬, ১০:১০ পূর্বাহ্ন

উন্নয়নের কৌশল সন্ধানে

মাইকেল স্পেন্স

প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নবিষয়ক কমিশন ২০০৮ সালে টেকসই প্রবৃদ্ধির ধরন প্রসঙ্গে আমাদের অর্জিত জ্ঞান হালনাগাদ করার উদ্দেশ্যে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই সময় আমার এই কমিশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য হয়। এখনকার মতো তখনো একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল, কয়েক দশক সময়ের মধ্যে যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে তা প্রবৃদ্ধি, কাঠামোগত পরিবর্তন, চাকরির ক্ষেত্র ও আয় বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্যের নাটকীয় হ্রাসের ওপর প্রভাব রেখেছে। এর প্রতিটির পারস্পরিক প্রভাব রয়েছে। এগুলো একই প্রণালীর নানা উপকরণ, যা পূর্ণ বিষয়টিকে কার্যকর করে। এর মধ্যে একটি উপকরণ বাদ পড়লে ফলাফলের ওপরও প্রভাব পড়বে।

বহু দেশ বা সমগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা ও অধঃগামী পরিস্থিতি তা বুঝতে অবশ্যই যা প্রকৃতপক্ষে ঘটেছে এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে ব্যাপক বৃদ্ধির জন্য কী ঘটা উচিত ছিল তার মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বহু নীতি রয়েছে, যার মাধ্যমে উচ্চ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব। ক্ষেত্রবিশেষে এগুলো বিভিন্ন দেশের নিজস্ব নীতির ওপর নির্ভর করে। তবে সাফল্যের জন্য কয়েকটি উপকরণ সব দেশের জন্যই অভিন্ন।

প্রথমত, উচ্চ হারে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ। উন্নয়নশীল সফল দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগ তাদের জিডিপির ৩০ শতাংশ বা আরো বেশি। এ ক্ষেত্রে সরকারি উপাদান (অবকাঠামো, অর্থনীতির জ্ঞান, প্রযুক্তির ভিত্তি) ৫-৭ শতাংশের মধ্যে থাকবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হবে পরস্পরের পরিপূরক।

বেসরকারি অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী বিনিয়োগের ওপর বেশ কয়েকটি বিষয় প্রভাব বিস্তার করে। ঝুঁকি ও বিনিয়োগের ওপরও এগুলোর প্রভাব রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কর্মীদের দক্ষতা, সম্পদের অধিকারের নিরাপত্তা, সংশ্লিষ্ট বৈধ প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। এগুলোর সাথে স্থিতিশীল বিনিয়োগের পরিবেশÑ সবই উপযুক্ত ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং বিকাশ অব্যাহত রাখার বিষয়টিকে প্রভাবিত করে। বিপরীতভাবে প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বা যুক্তিসঙ্গতভাবে সুসংহত কার্যসূচির প্রতি দায়বদ্ধতাও বিনিয়োগের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।

দ্বিতীয়ত, এই উচ্চপর্যায়ে বিনিয়োগের একটা বড় অংশ আসে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় থেকে। বাইরের সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরশীলতা অনেক ক্ষেত্রেই দুর্ভোগ বয়ে আনে। এগুলো ঋণসঙ্কট সৃষ্টি করে এবং প্রবৃদ্ধির বড় ধরনের সঙ্কট দেখা যায়। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বিশ্ব অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। মূলধনী হিসাব আরো জটিল বিষয়। সাধারণত সফল উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো অতিরিক্ত অবিশ্বাস এড়িয়ে এগুলোর যথার্থ ব্যবস্থাপনা করতে পারে। ভারসাম্যহীনতা এবং বাইরের অর্থিক সহায়তার ওপর থেকে অতিমাত্রায় নির্ভশীলতা কমানোর মাধ্যমে এগুলো করা সম্ভব। এ ছাড়াও বেশির ভাগ দেশই মুদ্রা বিনিময় হারের সাথে উৎপাদনশীলতার সমন্বয় করতে সক্ষম হয়। মুদ্রার অতি মূল্যায়ন বা অবমূল্যায়ন দু’টিরই ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তবে স্থিতিশীল উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে অতি মূল্যায়ন বেশি সঙ্কট সৃষ্টি করে।

চূড়ান্তভাবে অংশগ্রহণও সফল উন্নয়ন কৌশলের একটি উপাদান। আয়বৈষম্য যদি চরম না হয় এবং দুর্নীতি বা বাজারে সুবিধার প্রেক্ষিত যদি না আসে তাহলে সাধারণভাবে একে গ্রহণযোগ্য বলেই মনে করা হয়। শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সেবাগুলো উচ্চপর্যায়ের হলে সম-অধিকার নিশ্চিত হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। এরই প্রেক্ষাপটে যে কেউ বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান উন্নয়নপ্রক্রিয়া বা এর বিভিন্ন অংশে প্রবেশ করতে পারে।

সাধারণত সরকারি খাতে বিনিয়োগ টেকসই উন্নয়নের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না, বরং বেশ কম হয়। নানা সীমাবদ্ধতায় ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর পক্ষে অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয় না। নিয়মিত ঋণ পরিশোধ এ দেশগুলোর পক্ষে সম্ভব হয় না। একই সাথে ন্যূনতম প্রবৃদ্ধিও আটকে যায়। উন্নয়নমুখী নীতির অনুপস্থিতি এবং মুদ্রাস্ফীতিও লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে থাকে।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগও প্রত্যাশিত টেকসই উন্নয়ন পর্যায়ের চেয়ে অনেক নিচে। চাহিদা হ্রাস, নীতি ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা একই সাথে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে চীনের প্রবৃদ্ধির পরিস্থিতি- সবই বিনিয়োগ মাত্রা কমানোর জন্য দায়ী। এ ছাড়াও অর্থনীতির ওপর নির্ভর করার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ, কর সংস্কারে অচলাবস্থা তো রয়েছেই।

অংশগ্রহণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেই বলা যায়, অর্থনৈতিক কাঠামো এখন প্রযুক্তিনির্ভর, শ্রমবাজারেরও চাহিদা রয়েছে; তবে বিশ্বায়নের কারণে শিক্ষা এবং দক্ষতার যথাযথ সমন্বয় ঘটানো যায়নি, যার ফলে আয়বৈষম্য বেড়েছে।

সংক্ষেপে বিষয়টি বলতে গেলে, সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যগুলো দূর করতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রণোদনা বাড়াতে সংস্কার আনতে হবে। শ্রমবাজারের ভারসাম্যহীনতা ঠেকাতে এবং আয়বৈষম্য কমাতে সমন্বিত নীতি দাঁড় করাতে হবে।

(মাইকেল স্পেন্স : অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী মাইকেল স্পেন্স নিউ ইয়র্ক ইউনির্ভাসিটির স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের অর্থনীতির অধ্যাপক। তিনি হংকংয়ের এশিয়া গ্লোবাল ইনস্টিটিউশনের একাডেমিক বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বিশ্ব অর্থনীতি ফোরামের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।)

অনুবাদ : তানজিলা কাওকাব