মিডিয়া

এপ্রিল ৬, ২০১৬, ৯:৪৩ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে নিরপেক্ষ মিডিয়া প্রচণ্ড চাপে: অ্যামনেস্টি

নিউজ পেজ ডেস্ক

বাংলাদেশে নিরপেক্ষ মিডিয়া প্রচণ্ড চাপে রয়েছে। মুক্ত মত প্রকাশের ক্ষেত্রকে করা হয়েছে সীমাবদ্ধ। বিরোধী দলের শত শত সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৪০ জনেরও বেশি মানুষকে গুম করা হয়েছে। বিদেশি নাগরিকদের ওপর হামলা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে ইতালির একজন এনজিওকর্মী ও এক জাপানিকে। হামলা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার ও প্রকাশকদের ওপর। এতে কমপক্ষে ৫ জন নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিষ্ঠান অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

২০১৫ সালে ঘটে যাওয়া ঘটনার ওপর ভিত্তি করে ওই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে উঠে এসেছে সিলেটের শিশু শামিউল ইসলাম রাজন হত্যা প্রসঙ্গও। বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার বিরোধী আন্দোলন চালায়। সেই সময় কয়েক ডজন প্রাণ হারায়। আহত হন অনেকে। বিএনপির সিনিয়র সদস্যদের গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ এনেছে পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাকে জেল থেকে মুক্তি দেয়ার কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর পর বছরজুড়েই বার বার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মুক্তি দেয়ার আগে বিরোধী দলের কয়েক শত নেতাকর্মীকে দিনের পর দিন বা মাসের পর মাস আটক রাখা হয়। তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে। অ্যামনেস্টি আরও বলেছে, বিদেশি কয়েকজন নাগরিকও হামলার শিকার হয়েছেন অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের হাতে। ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ নভেম্বরের মধ্যে ইতালির একজন এনজিওকর্মী সিজার তাবেলা ও জাপানি নাগরিক হোশি কুনিওকে হত্যা করা হয়। বন্দুক হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছেন ইতালির একজন ডাক্তার। চুরির অভিযোগে জুলাই মাসে ১৩ বছর বয়সী বালক শামিউল ইসলাম রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় সিলেটে। এতে পথশিশুদের দুর্ভোগ উপেক্ষা করার জন্য ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। এর পর পরই এ হত্যাকাণ্ড তদন্তের নির্দেশ দেয় সরকার। বছর শেষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে বিচারের আওতায় ছিলেন কমপক্ষে ১৬ জন। মত প্রকাশের স্বাধীনতা অংশে বলা হয়েছে, সরকারের সমালোচনা করে এমন নিরপেক্ষ মিডিয়া রয়েছে প্রচন্ড চাপের মুখে। নভেম্বরে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সুপারিশ করে জাতীয় সংসদের সমালোচনা করার জন্য, দুর্নীতি বিরোধী এনজিও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নিবন্ধন বাতিল করা উচিত। বিচার সুষ্ঠু হয়নি বলে সমালোচনা করেছিলেন সুশীল সমাজের এমন ৪৯ ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঢাকার একটি আদালত আদালত অবমাননার অভিযোগ এনেছেন। নভেম্বরে সরকার সামাজিক যোগাযোগ মিডিয়া ও অন্যান্য যোগাযোগ মিডিয়া বন্ধ করে দেয়। এটা মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করে দেয়া বলে মন্তব্য করেছে অ্যামনেস্টি। এতে আরও বলা হয়, গত বছর নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ মত প্রকাশের কারণে ব্লগারদের ওপর হামলা চালায় কট্টরপন্থি গ্রুপগুলো। ফেব্রুয়ারিতে অভিজিত রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা রক্ষা পান। আগস্টে তিন ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান, নিলয় নীল ও অনন্ত বিজয় দাসকে হত্যা করা হয়। অক্টোবরে ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্যের এক প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দিপনকে হত্যা করা হয়। এ হামলায় রক্ষা পান দু’ ধর্মনিরপেক্ষ লেখক। অ্যামনেস্টি বলছে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে লেখা প্রকাশের মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ সরকার ব্লগার ও প্রকাশকদের অভিযুক্ত করেছেন।

গুম প্রসঙ্গে অ্যামনেস্টি তার রিপোর্টে বলেছে, সাদা পোশাকে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। পরে তারা কোথায় সে বিষয়ে তারা কিছু জানে না বলে দাবি করেছে। জাতীয় পত্রিকাগুলোর ওপর এক জরিপ চালিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র ইঙ্গিত দিয়েছে, কমপক্ষে ৪৩ জনকে গুম করা হয়েছে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। এর মধ্যে রয়েছেন দু’জন নারী। গুম হওয়া ৪৩ জনের মধ্যে পরে ৬ জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তুলে নেয়ার পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে ৪ জনকে। ৫ জনকে পাওয়া গেছে পুলিশি নিরাপত্তায়। বাকি ২৮ জন কোথায় বা তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা জানা যায় নি।

অ্যামনেস্টি তার রিপোর্টে বলছে, পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় নির্যাতন ও অশোভন আচরণ করা হয় ব্যাপকভাবে। নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত হয়েছে এমন ঘটনা বিরল।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, সরকার জানুয়ারিতে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। তাতে যেসব মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করতে চান তাদের জন্য ভীষণ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। ওদিকে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ওমেন লইয়ার্স এসোসিয়েশনের মতে, জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ২৪০টিরও বেশি ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্ষণ বেড়ে গেছে। কিন্তু অভিযুক্তদের শাস্তি পাওয়ার ঘটনা খুবই কম। এর কারণ, যথাযথ সময়ের অভাব ও কার্যকর তদন্তের অভাব। ধর্ষণের হাত থেকে যারা রক্ষা পেয়েছেন তাদেরকে প্রমাণ করতে হয় যে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদেরকে শারীরিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।

ওই রিপোর্টে মৃত্যুদণ্ডের অংশে বলা হয়েছে, গত বছর কমপক্ষে ১৯৮ জনের বিরুদ্ধে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে।

এর মধ্যে ৬ জন সিলেটে শিশু শামিউল ইসলাম রাজন হত্যার জন্য মৃত্যুদণ্ডের রায় পেয়েছে। একই রায় পেয়েছে ২০১৩ সালে পিতামাতাকে হত্যাকারী ঐশী রহমান। তার আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ঘটনার সময় ঐশীর বয়স ছিল ১৮ বছরের কম। তাই তাকে মৃত্যুদণ্ড না দেয়ার আর্জি জানিয়েছিলেন তারা। কিন্তু আদালত মেডিকেল পরীক্ষার কাগজপত্রে তার বয়স ১৯ বছর দেখতে পান এবং সে অনুযায়ী রায় দেন। বাংলাদেশ স্থাপিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার অপরাধের জন্য আরও চারজনকে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। অ্যামনেস্টি বলছে, এ আদালতের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ আছে। প্রসিকিউশনের সাক্ষীর দেয়া সাক্ষ্যকে বিবাদি পক্ষ মিথ্য বলে দাবি করে। সংঘটিত অপরাধের সময় সেই অপরাধ থেকে বিবাদী অনেক দূরে ছিলেন দাবি করলেও তা মানা হয় নি। বিদেশ থেকে বিবাদীপক্ষের জন্য সাক্ষ্য দিতে আসতে চাওয়া সাক্ষীদের সরকার ভিসা দেয় নি। রিপোর্টে বলা হয়েছে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও মানবাধিকার বিষযক সংগঠনগুলো ফাঁসি বন্ধের আহ্বান জানালেও গত বছর ৩ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।