শিল্প সাহিত্য

এপ্রিল ২২, ২০১৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ন

জুবাইদা গুলশান আরা : একজন জীবন শিল্পী

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক

ঢাকাঃ বাংলা সাহিত্যে জুবাইদা গুলশান আরা একটি সুপরিচিত নাম। উত্তরবঙ্গে বিখ্যাত হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে পদ্মা নদী ঘেঁষে সবুজ শ্যামলিমায় ছায়াময় বর্ধিষ্ণু গ্রাম রূপপুরে তাঁর শিকড় ও পিতৃভূমি। বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। সেই সুবাদে বদলির চাকরি। বাবার কর্মস্থল খুলনায় তার জন্ম। ছেলেবেলা কাটে কলকাতায় ও পরে দার্জিলিং কার্সিয়ং কালিম্পংয়ের পাহাড়ে। দুরন্ত শৈশব কাটিয়ে তিনি সমতলে নেমে আসেন।

টাঙ্গাইলের বিখ্যাত বিন্দুবাসিনী স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা, গান, আবৃত্তি সব ক্ষেত্রেই দক্ষতা ও সুনাম অর্জন করেন। ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন। পরে ইডেন কলেজ ও পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাস করে ভিকারুন নিসা গার্লস স্কুলে শিক্ষকতা করেন (১৯৬৩-১৯৬৪)। ১৯৬৪ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে নির্বাচিত হয়ে ঢাকা ইডেন গার্লস কলেজে প্রশাসক হিসেবে যোগ দেন।

সময়ের কঠিন পরীক্ষা পার হয়ে দেশের বিভিন্ন কলেজে সুনামের সঙ্গে অধ্যাপনা করে ক্রমশ বিভাগীয় প্রধান, উপাধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ২০০২-২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

আজকে যে মানুষটিকে সবাই সাহিত্যিক জুবাইদা শুলশান আরা নামে জানে, তাঁর বর্ণাঢ্য কৈশোর থেকে যে যাত্রা হয়, তার গোড়াপত্তন ঘটে ভাষা আন্দোলনের গান ও আবেগ নিয়ে। ভেতরের শক্তি যেন তাকে জাগিয়ে দেয় লেখকের স্বপ্ন নিয়ে। কৈশোরেই তার লেখালেখির শুরু। বরিশাল সদর গার্লস স্কুলে পড়ার সময় তার প্রথম কবিতা ছাপা হয় পত্রিকায়। তার বিপুল রচনা ও লেখার মধ্যে আছে উপন্যাস, মুক্তিযুদ্ধের কথা, ইতিহাসভিত্তিক ও গবেষণামূলক গ্রন্থ, শিশুতোষ গ্রন্থ। উপন্যাস সমগ্র প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ড, ঢাকার তিন শত বছরের ইতিহাস ও ঘটনাভিত্তিক উপন্যাস, প্রচুর ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও বিচিত্র শিশু জগতের রচনা। আমি যোদ্ধা অযুত বৎসর, কি লিখেছো তরবারী তুমি, ছোঁ বুড়ির দৌড়, অপরিচয়ের স্বপ্নযাত্রা, শিশু কিশোর সমগ্র, মন ছুটেছে তেপান্তরে, বাবুইপাখীর বাসা, আরো হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া অসংখ্য লেখা। তাঁর ছোটদের বই ‘গল্প তবু গল্প নয়’ ইউনিসেফ থেকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

জুবাইদা শুলশান আরা সম্মানিত হয়েছেন বহুবিধ পুরস্কারে। কবি আবুল হাসান স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৯), কমর মসতরী স্মৃতিপদক, বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন পদক, রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদক (২০০৫), শেরেবাংলা স্মৃতি পুরস্কার, কবি জসীমউদদীন পরিষদ পুরস্কার, ত্রিভুজ সাহিত্য সংসদ পুরস্কার, কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক প্রাপ্তির পরে বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশিন কর্তৃক সংবর্ধনা ও আরো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাহিত্য সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান থেকে সংবর্ধনা ও সম্মাননা লাভ করেন। চয়নসাহিত্য পত্রিকা স্বর্ণপদক (২০১৩), এ ছাড়া লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদকে (১৯৯৪) ভূষিত হন।

পেন ইন্টার ন্যাশনালের বাংলাদেশ শাখার সাহিত্যপত্র এবং লেখিকা সংঘের বার্ষিকী সঞ্চয়নের সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০২ সালে এশিয়ান উইমেন্স, ড্রামাটিক কনফারেন্স ফিলিপিনের ম্যানিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন ও তার তৈরি Short film-Women wake up its time ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেন। ২০০৪ সালে কলকাতা বইমেলায় ভাষা বিষয়ে বক্তৃতা করেন ও প্রচুর প্রশংসা লাভ করেন। ২০০৪ সালে সার্ক লিটারেচারি কনফারেন্সে (লাহোরে অনুষ্ঠিত) সাফল্যের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। ২০০৫ সালে তিনি ‘উইম্যান অব দ্য ইয়ার’ উপাধিতে ভূষিত হন।

ব্যক্তিগত জীবনে জুবাইদা গুলশান আরা দুই কন্যার জননী। বড় মেয়ে মুসবাহ চারুকলায়, ছোট মেয়ে মেহতাব আমীন ফটোগ্রাফার। স্বামী প্রফেসর মাহমুদ-উল-আমীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের খ্যাতিম্যান অধ্যাপক ছিলেন। সাত ভাই দুই বোনের মধ্যে তার বড় পাঁচ ভাই ছোট দুই ভাই এক বোন। ইউরোপের ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, ডেনমার্ক, সুইডেন ভ্রমণ করেছেন।

দায়িত্ব ও পেশা হিসেবে লেখাই তার প্রধান ভালোবাসা। তিরিশ বছরের অধিককাল অধ্যাপনা ছাড়া বন্ধুদের সঙ্গে সম্মিলনে তার হৃদয় উন্মুখ। সদা হাস্যোজ্জ্বল, সঙ্গীত ও ছবি আঁকা নিয়ে তাঁর আনন্দিত জীবন।

তার সাহিত্যে রয়েছে দেশমাতৃকা, দেশের প্রতি দায়বোধ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা। গভীর থেকে জীবনকে দেখার এক অসাধারণ ক্ষমতা তার সাহিত্যকে নিয়ে আসে জীবনের কাছাকাছি। সাধারণ মানুষ থেকে সুশীলসমাজ পর্যন্ত সব শ্রেণী ও পেশার মানুষের জীবনবোধ ও জীবনাচরণ তার সাহিত্যের পরতে পরতে চিত্রিত। জীবনকে নিয়েই ভাবেন তিনি। জীবনকেই উচ্চে তুলে ধরেন। আনন্দিত পরিশীলিত জীবনই তার কাম্য। সত্যিকারার্থে তিনি একজন জীবনশিল্পী।

আমরা তাঁর সাহিত্যিক জীবন আরো বিকশিত হোক, আনন্দ ও সাফল্য তার জীবনকে সফলতম করুক, এ কামনা করছি।

নিউজপেজ২৪/ এএ