তথ্যপ্রযুক্তি

এপ্রিল ২৮, ২০১৬, ২:৩৫ অপরাহ্ন

ভার্চুয়াল মাধ্যম কতটা নিরাপদ?

নিউজপেজ২৪ ডেস্ক

ঢাকা : ফেসবুক, ব্লগ ও টুইটারের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। যোগাযোগের এই নতুন মাধ্যমের দুয়ার সবার জন্য অবারিত। ভার্চুয়াল মাধ্যমের খপ্পরে পড়ে অনেক কিশোর-কিশোরীর লেখাপড়া উচ্ছন্নে গেছে।

স্কুল-কলেজপড়–য়া অনেক ছাত্রছাত্রীর ফেসবুক আসক্তি পরিবারের সুখ-শান্তি হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছে। স্কুল-কলেজে কম বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে জোড়া জোড়া হয়ে বন্ধুত্বের প্রবণতা বাড়ছে। অল্প বয়সে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে শুধু প্রেম নয়, বিয়ে করার প্রবণতা বাড়ছে। লেখাপড়ার বদলে শিক্ষার্থীরা ফেসবুকে বেশি সময় দিচ্ছে। ভালো খবরাখবর প্রচারের পাশাপাশি অশ্লীলতা, নষ্টামি, ন্যুড ছবি ও ভিডিওতে ফেসবুক ভরে গেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবারে, সমাজে।

প্রশ্ন হচ্ছে ভার্চুয়াল মাধ্যম কতটা নিরাপদ? মানুষ সমাজিক জীব। সেই আদিকাল থেকে মানুষ দলবদ্ধ-সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে আসছে। মানুষ যখন গুহায় ও বনে-জঙ্গলে বসবাস করতো তখনও সমাজবদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে সভ্যতার যুগে নদীর তীরে সমাজবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করে মানুষ। বিজ্ঞানের সাফল্যের যুগে সমাজবদ্ধ হওয়া ছাড়া বসবাস কল্পনাও করা যায় না।

বিশেষ করে বিজ্ঞানের উন্নতিতে গোটা পৃথিবী এখন একটি ভিলেজে পরিণত হয়েছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে চিঠি পৌঁছতে সপ্তাহ-মাস লেগে যেত, সেখানে মোবাইলে মিনিটের মধ্যেই কথা বলা যায়। কয়েক বছর আগে ফেসবুক, টুইটার, ব্লগসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম চালু হওয়ার পর মানুষের মধ্যে যোগাযোগ এখন মিনিটে মিনিটে সম্ভব। বিজ্ঞান যতই মানুষের জীবন-জীবিকা-চাহিদায় পরিবর্তন আনুক না কেন সমাজে বসবাস করার কিছু সাধারণ শিষ্টাচার আছে। সেটা শহরে হোক বা প্রত্যন্ত গ্রাম হোক। সোজা কথায় ভদ্রলোক হতে হয়। সমাজের আচার-আচরণ মেনে চলতে হয়। সভ্যতা-ভব্যতা, আদব-কায়দা, গুরুজনে সম্মান, বড়দের সম্মান, ছোটদের ¯েœহ, সমাজের নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়।

বিজ্ঞানের বদৌলতে মানুষ এখন মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার চেষ্টা করলেও এখনো সমাজবিরোধী কাজের জন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সমাজচ্যুত করার নিয়ম আছে। সমাজের নিয়মকানুন মেনে চলা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। কৃষিনির্ভর দেশে গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থা প্রায় অভিন্ন। কিন্তু শহরে অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে সমাজের ধারণা পাল্টিয়েছে। আগে মসজিককেন্দ্রিক এবং মহল্লার কয়েক গলি মিলে সমাজ হতো; এখন ফ্ল্যাট বাড়ি নিয়ে সমাজ। শিক্ষা আর অর্থবিত্তের বাড়-বাড়ন্তে ঢাকা শহরে সমাজ নানা ধারায় বিভক্ত। যেমন পার্টি, ক্লাব, সোসাইটি, সিভিলিয়ান, সুশীল, ডিপ্লোম্যাট কতো রকম সমাজ! একেকজন একেকভাবে বেড়ে ওঠেন এবং সমাজবদ্ধ থাকেন। তাদের নানা চরিত্র, নানা রঙ-রূপ। সব রূপ সবার জানার কথা নয়। কয়েক বছর আগে নাগরিকের মধ্যে নতুন যোগ হয়েছে ফেসবুক সমাজ।

এটাকে বলা হয় ভার্চুয়াল সমাজ। কম্পিউটার, মোবাইল, সফটওয়্যার, অ্যাপের সুবাদে গড়ে উঠেছে এই সমাজ। ভার্চুয়াল এই সমাজে অনেক সময় ব্যক্তি আড়ালে থেকে যান। ফেসবুক এখন সামাজিক যোগাযোগের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম। মতামত আদান-প্রদান, মতের প্রতি সমর্থন, পরিচিতি, জনমত গঠন ইত্যাদি হয়ে থাকে ফেসবুকে। অথচ দেখা যায় অদ্ভুত অদ্ভুত ছদ্মনামে ফেসবুক খোলা হয়েছে। ‘কাক’, ‘আমি পাখি,’ ‘ইচ্ছেঘুড়ি’, ‘কাকতাড়–য়া’, ‘উঁচু পাহাড়’, ‘একলা পথিক’, ‘প্রিন্সেস কাকী’, ‘প্রিন্স রতন’, ‘হাউকাউ’, ‘জেনারেশ জিরো’, ‘আমি একা’, ‘পরের জন্ম’, ‘নটআউট’, ‘গুটিবাজ’, ‘প্লেবয়’, ‘সেক্সি গার্লস’, ‘কালো ভাল্লুক’, ‘যাচ্ছেতাই’, ‘নোবডি’, ‘কাশবন’, ‘আমি কাঙ্গাল’ হাজারো ছদ্মনাম। ফেসবুকে এইসব নামের আড়ালে কোন মানুষ আছেন, তার বয়স কত, তা জানা দুষ্কর। এদের অনেকের প্রোফাইল পিকচার বা কাভার ফটোতে দেয়া হয় আকাশ, মেঘ, পাখি, প্রজাপতি, কাশবন, মানচিত্র, নদী, দলীয় পতাকা, কঙ্কাল, অস্থিমজ্জা, গরু, ভেড়া, নানা ফুল, দলের নাম, মানুষের, ডায়মন্ড, হর্তোন, ইস্কাপন, কলিজা, হার্ট চিহ্নসহ নানা কিসিমের ছবি। ছবি দেখে এই লোকগুলোও আসলে কারা, তাদের মুখম-ল কেমন তা বোঝার উপায় নেই। অথচ সমাজিকভাবে তারা পরিচিতি পাচ্ছে। মাসের পর মাস মতামত আদানপ্রদান করেও ছদ্মনামে ফেসবুকের মানুষকে অন্যেরা আবিষ্কার করতে পারেন না। চিনতে পারেন না।

এই যে ইসলামবিদ্বেষী লেখালেখির কারণে কয়েকজন ব্লগার খুন হলেন, তাদের অধিকাংশই নিজস্ব নামের বদলে ছদ্মনামে ব্লগে বা ফেসবুকে লেখালেখি করতেন। মত প্রকাশ করবেন অথচ নাম গোপন রাখার কৌশল নেবেন এটা কেমন রুচি? ফেসবুক এখন শক্তিশালী মাধ্যম। ফেসবুক, ব্লগ, টুইটারের মাধ্যমে বিভিন্ন ইস্যুতে জনমত গঠন করা হচ্ছে; এমনকি বিভিন্ন ইস্যুতে রাজপথে আন্দোলনও হচ্ছে। ফেসবুকের পরিচয়ে প্রেম-বিবাহ হচ্ছে। প্রেম-বিরহের পাশাপাশি বাকযুদ্ধ হচ্ছে। অনেক কিছু ঘটে যাচ্ছে চারপাশে ফেসবুকের পরিচয় সূত্র ধরে। ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ যদি যোগাযোগের মাধ্যম ও সমাজ হয় তাহলে সেখানে শৃঙ্খলা-রীতিনীতি থাকা দরকার। আর সামাজিক রীতিনীতিও সবার মানা আবশ্যক।

প্রশ্ন হচ্ছে সেটা কতটা মানা হচ্ছে? কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া তো আর যাই হোক মুক্তমত প্রকাশ বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়। ভুল তথ্য দেয়া কাউকে কষ্ট দেয়া তো মতের আদান-প্রদান হতে পারে না। নানা অডিও-ভিডিও এবং দৃশ্য ফেসবুকে পোস্ট করা হয়। সেগুলোর মধ্যে অনেক অশ্লীল দৃশ্য থাকে। সমাজ যা পছন্দ করে না সে নোংরা দৃশ্যের ছবি বা অডিও ফেসবুকে দেয়া কোন ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা? আপনি মদ খাচ্ছেন, পতিতা পল্লীতে গেছেন, বাসররাত উদযাপন করছেন সেটা ফেসবুকে দেয়া কতোটা সমীচীন? ইদানীং ফেসবুকে এমন সব দৃশ্য শেয়ার করা হচ্ছে যা উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীরা বয়সের কারণেই দারুণভাবে আকৃষ্ট হচ্ছে। ওই সব দৃশ্য এতো গোপনীয় যে তা প্রকাশ করা সত্যিই পশুত্ব। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী কী করেন সেটা সবাই জানেন। কিন্তু সে দৃশ্য প্রচার করা বা সে অভিজ্ঞতা প্রচার করা কি শোভনীয়? আপনার স্বাধীনতা কিন্তু আমার নাকের ডগা পর্যন্ত। বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ৭/৮ বছর বয়সী ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত এখন ফেসবুক ঘাঁটাঘাঁটি করেন। সেখানে অশ্লীল দৃশ্য, নারীর খোলামেলা ছবি, মানুষের গোপনাঙ্গের চিত্র ও স্পর্শকাতর অঙ্গের বর্ণনা দেয়া কি সুস্থ রুচির পরিচায়ক? আর স্পর্শকাতর বিষয় পোস্ট করা কি শোভনীয়? আপনি যা পেস্ট করছেন তা হাজার হাজার মানুষ দেখবে।

জনৈক ষোড়শী নানারকম খোলামেলা ছবি ফেসবুকে দিয়ে লাখ লাখ ফলোয়ার পেয়ে গেলেন। তিনি সেলিব্রেটি, সিনেমার নায়িকা-গায়িকার মতো পরিচিতি পেয়ে গেলেন। তার দেখাদেখি প্রতিযোগিতায় নামলেন সে বয়সী আরো কয়েকজন। তারা বললেন, ‘অমুকের নিতম্বের চেয়ে আমারটা ভাল। আমি তার চেয়ে অনেক স্মার্ট। আমার বয়স কম, ফিগার ভালো’ ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রায়ই ফেসবুকে এমন দৃশ্য দেখা যায়। প্রতিযোগিতার খবর পাওয়া যায়। প্রশ্ন হলো আপনি যে ছবি ও দৃশ্য দিচ্ছেন সেইসব ছবি আর ছবির সুন্দরীদের ফলো করছেন অনেক স্কুলপড়–য়া শিশুরাও। সেটা সমাজে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে? শিশুরা ফেসবুকে কী শিখছে? মুক্তমতের নামে ফেসবুকে ইসলামবিদ্বেষী লেখালেখি যেমন হচ্ছে; তেমনি উল্টোটাও হচ্ছে।

প্রায়শই দেখা যায় ফেসবুকে স্পর্শকতার বিষয় ও ধর্মীয় পোস্ট। দেয়া হয় কা’বা ঘরের ছবি। পরেরটাই অশ্লীল দৃশ্যের ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। একটা পোস্ট বহুবার চোখে পড়েছে, তা হলো আমাদের মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা:)-এর পায়ের ছাপ এবং চুল। যিনি পোস্ট করছেন তিনি লিখেছেন ‘এটা নবীজির পায়ের ছাপ, কেউ এড়িয়ে যাবেন না, এতোবার শেয়ার করলে এতো লাখ নেকি ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কি মহানবী (সা.)-কে ভালোবেসে করা হয়, না অজ্ঞতার কারণে করা হয়। ফেসবুকে অডিও-ভিডিও এবং বক্তব্য-কাহিনী পোস্ট করার সময় দায়িত্বশীল হওয়া খুবই জরুরী। কারণ একটি বক্তব্য ও ছবি পোস্ট করার পর ফেসবুকে হাজার হাজার লোক দেখেন। হাজার হাজার, লাখ লাখ ব্যক্তি নিয়ে ফেসবুক সমাজ। এই সমাজের ফলোয়ারদের দায়িত্বশীল হওয়াটা জরুরী। বাসের গায়ে থাকেÑ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’। ফেসবুকে আপনার বক্তব্য, পোস্ট আপনার ব্যক্তিগত, পারিবারিক পরিচয় তুলে ধরে।

অতএব সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন বিষয় ফেসবুকে পোস্ট না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আপনার পোস্ট করা দৃশ্য যদি আপনি স্ত্রী ছেলেমেয়ে, বাবা-মাকে নিয়ে দেখতে না পারেন তাহলে সেটা পোস্ট করা বিকৃত রুচির পরিচায়ক। ফেসবুক হোক সবার জন্য শিক্ষণীয় মাধ্যম; নতুন প্রজন্মের জীবন ধ্বংসের নয়।

নিউজপেজ২৪/ এএ