শিল্প সাহিত্য

জুন ৪, ২০১৬, ১০:৫৪ অপরাহ্ন

বই আলোচনা : টাট্টুঘোড়ার ডিম

নিউজপেজ২৪ ডেস্ক

ঢাকাঃ সহজ শব্দ আর সরল বিষয় নিয়ে লেখা একটি ছড়াগ্রন্থ ‘টাট্টুঘোড়ার ডিম’ পড়ার আমার সুযোগ হয়েছে। বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের নির্বাচিত লেখক বোরহান মাসুদ বাংলাদেশ শিশু একাডেমির নিজস্ব প্রকাশনা বিভাগেও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। ‘টাট্টুঘোড়ার ডিম’ বইটি লেখকের প্রথম বই হিসেবে সত্যিই চমৎকারিত্বের দাবি রাখে। একেবারেই ছোটদের জন্য লেখা এ বইয়ের ছড়াগুলো বড়দেরও আনন্দ দিতে প্রস্তুত।

বইয়ের শেষে ‘টাট্টুঘোড়ার ডিম’ শিরোনামে যে ছড়াটি আছে তা এমন-
‘শিশু যখন শিল্পী তখন আঁকতে পারে সব
আঁকতে পারে ব্যালকনিতে গোলাপফুলের টব।
আঁকতে পারে নদ-নদী আর সবুজ-শ্যামল মাঠ
আঁকতে পারে রূপকাহিনী চম্পাবতীর ঘাট।’
চমৎকার এ ছড়াটি ২০১৩ সালে মিনা অ্যাওয়ার্ডে মনোনীত হয়েছিল।

তার লেখালেখি অষ্টম শ্রেণি থেকে শুরু। এরপর দেশের প্রায় সবগুলো দৈনিকসহ বিভিন্ন ম্যাগাজিনেও তার একাধিক লেখা ছাপা হয়েছে। তিনি বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। চারিদিকে পানি বেষ্টিত দ্বীপজেলা ভোলার সন্তান ছড়াকার বোরহান মাসুদ অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় ‘মা ও নদী’ ছড়ার প্রথম দুটি পঙতিতে লিখেছেন-
‘বাড়ি আমার যে নদীটির পাড়
সেই পাড়েতে ছায়া আছে মা’র।’
প্রত্যেক মানুষেরই জন্মস্থান বা জন্মভূমির প্রতি এক অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসার মায়া মনের অজান্তেই লেপন হয়ে থাকে, যা কখনোই মুছে যায় না। আর সে ব্যক্তি যদি হয় কোনো কবি বা লেখক তবে তার লেখায় সেই স্থানের কথা ঘুরে-ফিরে বারবার বিবৃত হতে পারে এটাই স্বাভাবিক। ছড়াকার বোরহান মাসুদও এর ব্যতিক্রম নন, আর তাই তো তার প্রায় প্রতিটি ছড়ার মাঝেই ফুটে উঠেছে সে সব বিবরণ।

‘মেঘনা নদী’ ছড়ায় বোরহান লিখেছেন-
‘মেঘনা নদীর শান্ত পাড়ে শান্ত মায়ের মুখ
শান্ত হাওয়া ফুরফুরানো যায় জুড়িয়ে বুক।’
এই মা যে তার প্রিয় জন্মভূমি বা বাংলাদেশ তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। আবার একই ছড়ায় তিনি লেখেন-
‘এই যে নদীর পাড়ে আমার পাতায় ছাওয়া ঘর
বছর বছর নদীর ভাঙন জাগায় আবার চর।’
এই যে আবহমান বাংলার চিরচেনা ও বাস্তব চিত্রই তার লেখায় স্থান পেয়েছে।

আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ যেন পুরোটাই একটা গ্রাম এবং সে গ্রামের চিত্র সবখানেই এক আর তাইতো যে দিকেই তাকাই দেখতে পাই নদী আর নদী। এর কোনোটা খরস্রোতা আবার কোথাও শান্ত জলের চলমান গতি এ যেন রুদ্রের পাশে কোমল বসবাস! শিশু-সাহিত্যে এ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়ছে, শুধু শিশু-সাহিত্য বলছি কেন পুরো বাংলা সাহিত্যের পরতে পরতে মিশে আছে আবহমান বাংলার অপার প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা। তবুও বর্তমান সাহিত্যের মধ্যে অন্তত কিছুটা হলেও এর অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সে ক্ষেত্রে বোরহান মাসুদ একটু যেন আলাদা হয়ে তার চেনা-জানা পথের দৃশ্যগুলো ছন্দের দোলায় দোলায়িত করে শিশুদের উপজীব্য করে লিখেছেন।

বরাবরের মত অনেক ছড়াই প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু ইদানিং অনেকের লেখার মধ্যেই বায়বীয়তায় ভরপুর দেখা যায়, যেমন সে সব ছড়ায় না থাকে কোন বিষয়বস্তু, না থাকে তার বিষয়-বৈচিত্র্য। মন চাইলো আর লিখে দিলাম ছড়া তা তো হতে পারে না। ‘আকাশ’ নামক ছড়ায় বোরহান লিখেছেন-
‘আকাশ’ ছিলো চোখের কাজল
চাঁদের মতো টিপ
তার নামেতেই উঠলো জেগে
সোনালী এক দ্বীপ।’
কত সরল বাক্যে তার জন্ম-দ্বীপের বর্ণনা করেছেন তা পুরো ছড়াটি না পড়লে বোঝা যাবে না। এটাই একজন সত্যিকারের ছড়াকারের গুণ বা মুন্সিয়ানা।

তার প্রতিটি ছড়ার শিরোনামও যেন একেবারেই মাটিঘেষা কোমলতায় ঠাসা। বইয়ের প্রথম ছড়াটি এমন-
‘যখন কিছু ভাল্লাগে না, কেমন করে মন
ঢেউয়ের মতো উছলে ওঠে, কষ্ট সারাক্ষণ।
তখন আমি পড়তে বসি, মজার মজার বই
বইয়ের পাতায় খুশির নাচন, আনন্দ-হইচই।’
এই যে বই পড়ার প্রতি আহ্বান করা। ‘বিশেষ করে শিশুদেরকে’। এটা আমাদের মনে আশার আলো জ্বালাতে পারে।

বোরহান মাসুদের প্রতিটি ছড়ায় রয়েছে এমন শ্রুতিমধুর ছন্দ আর বিষয়-বৈশিষ্ট্য। দেশের খ্যাতনামা চিত্রকর হাশেম খানের নান্দনিক প্রচ্ছদ আর প্রতিটি ছড়ার জন্য ভিন্ন ভিন্ন যে ছবিগুলো তিনি এঁকেছেন তাতেও ফুটে উঠেছে আমাদের গ্রাম-বাংলার অপরূপ দৃশ্য আর শিশুদের নজরকাড়া চিত্র।

নিরেট ছন্দময় ‘টাট্টুঘোড়ার ডিম’ বইটি যৌথভাবে উৎসর্গ করা হয়েছে বরেণ্য চিত্রশিল্পী হাশেম খান ও কবি নাসির আহমেদকে। আদিগন্ত প্রকাশন থেকে প্রকাশিত মনোমুগ্ধকর এসব ছড়া সম্বলিত এ বইটির প্রকাশক মোশতাক রায়হান। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ১৫০ টাকা।

আমার বিশ্বাস, ছড়াকার বোরহান মাসুদের লেখাগুলো সব শ্রেণির পাঠক মনে আনন্দের দোলা দিবে এবং বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মনেও মৌলিক ভাবনার উদ্রেক ঘটাতে সক্ষম হবে।

লেখক: কবি ও আলোচক

নিউজপেজ২৪/ এএ