জুলাই ১৮, ২০১৬, ৫:১০ অপরাহ্ন

তুরস্কের পূর্বেকার চার সামরিক সফল ক্যু বনাম এবারের বিফল ক্যু: কিছু পর্যালোচনা

হাফিজুর রহমান, অতিথি লেখক

আনকারা, তুরস্ক থেকেঃ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানী খিলাফতের পতনের পর সেনাপ্রধান মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে ১৯২০ সালের ২৩ এপ্রিল পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২৩ সালে নতুন সংবিধান ও তুর্কিশ রিপাবলিক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত পার্লামেন্টের মাধ্যমেই দেশ পরিচালিত হয়েছে। তখন স্পীকার ছিলেন আতাতুর্ক, যিনি পরবর্তীতে (১৯২৩) প্রেসিডেন্ট হন আমৃত্যু (১৯৩৮ সালের ১০ নভেম্বর) এ পদে বহাল ছিলেন।

তার মৃত্যুর পর ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তার দল (CHP) ক্ষমতায় ছিল। এই ৩০ বছরে তারা তুরস্ককে এমন এক সেক্যুলার ভিত্তির উপর রাষ্ট্রকে দাড় করিয়েছে যা এখনো ভাঙ্গা সম্বব হয়নি। এখনো প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী কিংবা পার্লামেন্ট মেম্বারদের শপথ নেওয়ার সময় ১ মিনিটের শপথ বাক্যে যে কয়টি শব্দ আছে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল, আতাতুর্কের মাধ্যমে অর্জিত বিজয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে রাষ্ট্র সংরক্ষণে শপথ নিচ্ছি।

আর আতাতুর্ক সেনাবাহিনী থেকে আসার কারনে পুরো সেনাবাহিনীকেই সে কঠোর ইসলাম বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে সফল হয়েছিল।তাইতো পরবর্তী সময়ে যখনই ইসলাম ও ইসলামী চেতনা কিছুটা মাথা ঝাড়া দিয়ে দাড়াতে চেয়েছে তখনই সেনাবাহিনী ক্যু করেছে।

এক- ১৯৬০ সালের প্রথম ক্যু:
১৯৫০ সালে প্রথম আতাতুর্কের দল বিরোধী দলের কাছে পরাজিত হয়, যারা কিছুটা ডানপন্থী ছিল। ক্ষমতায় গেলে ইসলাম পালনে বিধিনিষেধ কিছুটা কমাবে এবং আরবীতে আযান পুন:প্রচলন করা হবে এমন ইশতিহারে লোকজনের ব্যপক ভোট পেয়ে ক্ষমতায় আসেন আদনান মেন্দেরেস। ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু ক্যুয়ের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং তাকে ফাসিঁ দেওয়া হয়।১৯৬০ সালের ২৭ মে রাত ৩ টায় সামরিক বাহিনী সামরিকশাসন জারি করে কারফিউ আরোপ করে। অনেকটা নিরবেই তারা ক্ষমতায় নিয়ে নেয়। কেউ সাহস করেনী রাস্তায় নামতে।ক্যু পরবর্তীতে সরকারী পক্ষের সামরিক বাহিনীর অফিসার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, বিচারকসহ বিশাল অংশকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। সরকারী দলের বিশাল অংশকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে দল নিষিদ্ধ ও এর প্রধান আদনান মেন্দেরেসসহ বেশ কয়েকজন জাতীয় নেতাকে ফাসিঁ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে তারা ধর্মনিরপেক্ষতার উপর জোড় দিয়ে নতুন সংবিধান প্রনয়ন করে এবং নির্বাচনে সেনাসমর্থনে ক্ষমতায় আসে সেই আতাতুর্কের দল।

দুই- ১৯৭১ সালের দ্বিতীয় ক্যু (মেমোরেন্ডাম..):
১৯৬৫ সালের নির্বাচনে আদনান মেন্দেরেসের সাপোর্টার ও ডানপন্থীদের নিয়ে গঠিত দলের প্রধান সোলেমান দেমিরেল প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিতশীলতা কাটতেছিলনা। চারদিকেই শুধু বিদ্রোহ হচ্ছিল। তখন সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ১২ ই মার্চ এক মেমোরেন্ডাম ইস্যু করে। প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করে তারা আতাতুর্কের বুনিয়াদের উপর রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশ দেয় এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির জন্য শর্ত দেয়। আর অন্যথায় তারা ক্ষমতা নিয়ে নেওয়ার কথা বলে। সেনা ট্যাঙ্ক মোতায়েন করা হয়। তিনঘন্টা আলোচনার পর দেমিরেল পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। জনগন এ ক্যুতে খুববেশী আশ্চর্য্য হয়নি তবে অনিশ্চয়তার মধ্যে পরে যায়।

তিন- রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান:
এবারের ক্যু ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম বড় কারন সকল রাজনৈতিক দলের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে একত্র অবস্থান। কেননা আগেকার ক্যুগুলোতে রাজনৈতিক দলের একটা অংশ সেনাবাহিনীর পক্ষে চলে গিয়েছিল।

চার- বীর তুর্কি জাতি:
জনতার অবদান সবচেয়ে বেশী। জীবন বাজি রেখে ট্যাঙ্কের নিচে পরে যাওয়ার ছবি দেখে বাহবা দেওযা সহজ কিন্তু নিজে ট্যাঙ্কের সামনে দাড়িয়ে শার্ট খুলে দেওয়া কঠিন! আমার নিজচোখে দেখা শতশত ট্যঙ্ক যাচ্ছে আর উপর দিয়ে যুদ্ধবিমানের সমানে টহল। এ পরিস্থিতিতে নিজের গাড়ী ট্যাঙ্কের সামনে বেরিকেড দেওয়ার চেষ্টা কতটা সাহসী প্রদক্ষেপ তা নিজ চোখে না দেখালে বুঝানো কঠিন। এ কাজ করতে গিয়ে অনেকগুলো গাড়ী পিশে ফেলেছে সেনাবাহিনী। তারপরও জনতা হাল ছাড়েনী। ইস্তাম্বুলে সেনাবাহিনীর গুলি জনতাকে মাঠ ছাড়া করতে পারে নাই।
পাঁচ- সামরিক বাহিনীর নৈতিকভাবে সাহস হারিয়ে ফেলা-

সামরিক বাহিনী হয়তো ভেবেছিল আগেকার মত কেউই নামবেনা। আর নামলেও সামান্য কিছু নামবে তাদেরকে শেষ করে ক্ষমতা নিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু যখন চারপাশ দিয়ে স্রোতের মত জনতা রাজপথে নেমে পরল এবং তাদের ট্যাঙ্কগুলোকে অকেজো করতে সমানে জীবন দেওয়া শুরু করে দিল তখন তারা নৈতিকভাবে সাহস হারিয়ে ফেলল। পিছু হটতে বাধ্য হল।

ছয়- পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও মিডিয়ার ভূমিকা:
দুনিয়ার ইতিহাসে পুলিশ দিয়ে সামরিক শাসন প্রতিরোধ করা হয়েছে এটা আমার জানা নাই। কিন্তু তুর্কির পুলিশ বাহিনী সেই কাজটাই করেছে। গোয়েন্দা সংস্থা প্রেসিডেন্টকে ঐতিহাসিক সাপোর্ট দিয়েছে। আর মিডিয়াতো জীবন বাজি রেখে লড়েছে।



লেখকঃ হাফিজুর রহমান, পিএইচডি গবেষক
গাজী বিশ্ববিদ্যালয়, আনকারা, তুরস্ক


নিউজপেজ২৪/ এএ