রাজনীতি

এপ্রিল ২৩, ২০১৭, ৫:৩৩ অপরাহ্ন

ক্ষোভ ঝাড়লেন ওবায়দুল কাদের

নিউজপেজ ডেস্ক

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সম্মেলনে রাউজান ও সীতাকুণ্ড উপজেলার নেতাদের বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। দুই উপজেলার নেতাকর্মীরা সভায় তুমুল হইচই করে। তখন মঞ্চে বসা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমন দৃশ্য দেখে তার বক্তব্যের শুরুতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হবে আওয়ামী লীগ।

গতকাল শনিবার উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের চার বছর পর প্রথমবারের মতো প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

নগরীর পাঁচলাইশ এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত টানা ৫ ঘণ্টা সভা চলে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, চট্টগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফসহ কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতারা এতে অংশ নেন। সম্মেলনে ইউনিয়ন ও উপজেলার মোট ২৩ জন নেতা বক্তব্য রাখেন।

রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোসলেম উদ্দিন খান যখন বক্তব্য দিতে মঞ্চে উঠলেন তখন মঞ্চের বাম পাশের সারিতে বসা কিছু সংখ্যক নেতাকর্মী ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে চিৎকার শুরু করেন। এসব নেতাকর্মী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও রাউজানের সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর অনুসারী। তিনি তখন মঞ্চে বসা ছিলেন। নিজের নেতাকর্মীদের উত্তেজিত হতে দেখে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ফজলে করিম বললেন, ‘তোঁয়ারা ন চিক্কিরাইয়্যু, চুপ থাহো। ইবারে আঁই বক্তব্য দিতাম হইয়্যিযি। আঁরার একজন অ দিবু।’ (তোমরা চিৎকার করো না, চুপ থাকো। আমি তাকে বক্তব্য দিতে দেওয়ার জন্য বলেছি। আমাদের একজনও রাখবে।

রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোসলেম উদ্দিন খান ফজলে করিমের বিরোধী হিসেবে পরিচিত। উপজেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কামাল উদ্দিন হলেন ফজলে করিমের অনুসারী। তাকেও বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

মোসলেম উদ্দিন খান তার বক্তব্যে রাউজানে দলীয় কোন্দলের কথা উল্লেখ করে তা নিরসনে কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাউজানে ফজলে করিম চৌধুরী, পৌর মেয়র দেবাশীষ পালিত এবং ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনের নেতৃত্বে তিনটি ধারা রয়েছে।
সম্মেলনে ৬টি উপজেলা থেকে সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকের একজনকে বক্তব্য দিতে দেওয়া হলেও কেবল রাউজান থেকে দুজনকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের দুই নেতার বিরোধও সামনে এসেছে সম্মেলনে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল বাকের ভূঁইয়া যখন তার বক্তব্যে সীতাকুণ্ডের সংসদ সদস্য দিদারুল আলমের প্রশংসা করছিলেন তখন ‘ভুয়া-ভুয়া’ বলে চিৎকার করে উঠেন প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীরা। মঞ্চে বসা আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম বিভাগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম তখন মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে এসব নেতাকর্মীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। এর আগে সীতাকুণ্ডের ২ নম্বর বারিয়ারডালা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রেহান উদ্দিন বক্তব্য রাখার সময়ও নেতাকর্মীরা হইচই করেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সীতাকুণ্ডে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত আবুল কাশেম মাস্টারের ছেলে এস এম আল মামুন ও সংসদ সদস্য দিদারুল আলমের নেতৃত্বে দুটি ধারা রয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল বাকের ভূঁইয়া ও বারিয়ারডালা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রেহান উদ্দিন দিদারুল আলমের অনুসারী। এস এম আল মামুন জেলা যুবলীগের সভাপতি পদে আছেন। তিনিও মঞ্চে উপসি’ত ছিলেন।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তার বক্তব্যে দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধকে ‘ভুল বুঝাবুঝি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তিলে তিলে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগকে গড়ে তুলেছি। এ সংগঠনের জন্য ১৯৮০ সালে আমার রক্ত ঝরেছে নিউ মার্কেটের মোড়ে। আমার পায়ের রগ কেটে দিয়েছিল। পেছনে ছুরি মেরেছিল। এতো কষ্ট করে সংগঠনটাকে দাঁড় করিয়েছি। কাজেই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি ‘রাখডাক’ করে বললেও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মঞ্চের নেতাদের চোখে চোখে তাকিয়ে কড়া ভাষায় এনিয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন।
তিনি তার বক্তব্যের শুরুতে বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে বিএনপি আমাদের প্রতিপক্ষ হবে না। আমাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হবে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ হলে কেউ রক্ষা করতে পারবে না।’
তিনি তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ করে নৌকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যারা করে তাদের দলের প্রতি কোনো আনুগত্য-ভালোবাসা নেই। যেসব নেতারা দলের গলা কাটে, ছুরিকাঘাত করে তারা দলের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছে।’

মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এদের ব্যাপারে নেত্রীর কাছে রিপোর্ট আছে। মনে করবেন না, এখানে-ওখানে কিছু কিছু ঘটনা ঘটছে। এগুলো আমাদের নজরের বাইরে। আমরা প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছি। সময় মতো সবাই টের পাবেন। কত ধানে কত চাল। যত প্রভাবশালী নেতাই হোন না কেন কেউ পার পাবেন না।’

‘যারা আজকে দলের মধ্যে বিদ্রোহ করছেন, অপকর্ম করছেন, তাদের আগামী নির্বাচনে ওই রিপোর্টের মুখোমুখি হতে হবে’, ’বলেন তিনি।

ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ‘ প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী-কুমিল্লার চেহারা পাল্টে দিয়েছেন উন্নয়ন দিয়ে। অথচ আমরা কলহের আগুন আর অপকর্ম করে উন্নয়নকে ম্লান করে দিয়েছি।’
ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমি ছাত্রলীগকে বলছি, দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় এমন কাজ হলে আমরা সাংগঠনিকভাবে এবং প্রশাসনিকভাবে আমরা কাউকে রেহাই দেব না।’

বিএনপির সমালোচনা করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তাদের নাকি নির্বাচনে ডাকতে হবে। আরে ডাকতে হবে কেন? আপনারা যখন ক্ষমতায় তখন আমাদের নির্বাচনে ডেকেছিলেন? কে কাকে ডাকে? ভুল গতবার করেছেন। ভুলের চোরাবালিতে আটকে আছেন। এই চোরাবালি থেকে বের না হলে আপনাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব আগামী নির্বাচনে ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ফজলে করিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এম এ সালামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। সম্মেলনে উপসি’ত ছিলেন আওয়ামী লীগের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, উপ দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়-য়া, সন্দ্বীপের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা প্রমুখ।



নিউজপেজ২৪/ এ বি