রাজনীতি

এপ্রিল ২৫, ২০১৭, ১১:২৯ পূর্বাহ্ন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সারাদেশে তান্ডব চালাচ্ছে - রিজভী

নিউজপেজ ডেস্ক

বিশেষ অভিযানের নামে বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে পুলিশ ও ডিবি পুলিশ হানা দিয়ে ব্যাপক তা-ব চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, বাড়িতে নেতা-কর্মীদের না পেলে তাদের পরিবারের সদস্যদের লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। এমনকি শিশুরাও রক্ষা পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিপীড়ন থেকে। গতকাল সোমবার নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই বিশেষ অভিযানের নামে দেশব্যাপী বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের আবারও গণগ্রেফতার শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিশেষ অভিযানের নামে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে পুলিশ ও ডিবি পুলিশ হানা দিয়ে ব্যাপক তা-ব চালাচ্ছে। বাড়িতে নেতা-কর্মীদের না পেলে তাদের পরিবারের সদস্যদের লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। এমনকি শিশুরাও রক্ষা পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিপীড়ন থেকে।

রিজভী বলেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির নবনির্বাচিত সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেলসহ নেতৃবৃন্দকে সংবর্ধনা দিয়ে ফেরার পথে মতিঝিল থানার ৯ নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা শামসুদ্দিন বকুল এবং হারুন মিয়াকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। শিল্প নগরী টঙ্গী এলাকায় পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা মিলে অভিযানের নামে গোটা এলাকায় তা-ব চালিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এ সময় ২০ দলীয় জোটের ১৫ জন নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এই তা-বে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডার এমনকি মাদক ব্যবসায়ীরাও যুক্ত হওয়ায় পুরো এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয় এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এইভাবে টঙ্গীতে একযোগে ১৫টি ওয়ার্ডে বিএনপিসহ বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের বাসায় তল্লাশীর নামে হামলা চালানো হয়।

এছাড়া গত দু’দিনে জামালপুরে বিশেষ অভিযানের নামে ১৮৯ জন নেতাকর্মীকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সাতক্ষীরায় পুলিশের বিশেষ অভিযানের নামে ৪১ জন নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। ঝিনাইদহ ও মেহেরপুরে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে, সেখানে গত কয়েকদিনে গ্রেফতার করা হয় শতাধিক নেতাকর্মীকে। বাগেরহাটে বিরোধী দলীয় ৩৯ জন নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। পঞ্চগড়ে নেতাকর্মীদের বিভিন্ন হুমকি-ধমকি দেয়া হচ্ছে, তাদের গতিবিধির উপর নজরদারি হচ্ছে। গত তিন দিন আগে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হেলালউদ্দিনকে গোয়েন্দা পুলিশ আটক করে নিয়ে যায়। গ্রেফতার করা হয়েছে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত কাউন্সিলর একরাম হোসেন বাবুকে। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় পরোয়ানা জারি করা হয়েছে কুমিল্লার নবনির্বাচিত মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর বিরুদ্ধে। মেহেরপুরে জেলা বিএনপির সভাপতি মাসুদ অরুনসহ ২০০ জনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের এবং ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একইভাবে ঢাকা জেলা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, চুয়াডাঙ্গা, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশি অভিযানের নামে ব্যাপক ধরপাকড় ও হয়রানি-নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে।

রিজভী বলেন, গত ২২ এপ্রিল আলমডাঙ্গায় ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শওকত আলী ফরাজীকে দিনে-দুপুরে আওয়ামী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে। আমি শওকত আলী ফরাজীকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যাকারী সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানাচ্ছি।

বিএনপির এ নেতা বলেন, সরকারের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়ে চোরাবালির মধ্যে ডুবে যাচ্ছে, যার কারনে এখন বকধার্মিক সাজছে। যে হেফাজতের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে নিরীহ ছাত্র ও আলেমদের ওপর পৈশাচিক রক্তাক্ত আক্রমণ চালিয়ে হত্যাকান্ড চালানো হয়েছে তা দেশব্যাপী ভুলে যায়নি। বিশেষ নজরদারির নামে সারাদেশে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের জঙ্গীদের সাথে যুক্ত করে যেভাবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা পুলিশরা দলন-পীড়ণ করে হয়রানী ও জুলুম করেছে তা নজীরবিহীন। এখন আবার সরকার সেই হেফাজতের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলতে চাচ্ছে শুধুমাত্র ভোটের জন্য। এটা বর্তমান ভোটারবিহীন সরকার ও সরকার প্রধানের আপোষকামী অনৈতিক রাজনীতির এক কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত। অতীতেও বর্তমান সরকারপ্রধান ধর্মীয় লেবাস পরিধান করে জনগণকে ধোকা দিয়েছেন। ভোট শেষ হওয়ার পরে লেবাস খুলে স্বমূর্তি ধারণ করেন। তাঁর এই দ্বিচারিমূলক রাজনীতি যাতে কেউ ধরতে না পারে সেজন্য দেশব্যাপী বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে জুলুমের অভিযান চলছে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী যেসব সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি করেছেন সেটি নিয়ে সারাদেশের মানুষ ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। দেশের মানুষের আকাক্সক্ষাকে তাচ্ছিল্য করে দেশের সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দেয়ার জন্য দেশবাসী এই ভোটারবিহীন সরকারকে ধিক্কার জানাচ্ছে। ভারতের সাথে এই সমঝোতা স্মারক চুক্তিতে গোটা জাতির নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতের কাছ থেকে একটি সরিষার দানাও আদায় করতে পারেনি, তিস্তার এক বালতি পানি পাওয়ারও গ্যারান্টি পাননি। কুটনৈতিক প্রজ্ঞা প্রদর্শণের বদলে প্রধানমন্ত্রী শুধুমাত্র দেশ বেচা-বিক্রির খেলায় মেতে উঠেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারতে ব্যর্থ সফরে জনমনে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে সেটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতেই দেশব্যাপী বিএনপিসহ বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর জান্তব হিং¯্রতায় সরকারী বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জসহ হাওর এলাকাগুলোতে মেঘালয়ের পাহাড় থেকে বয়ে আসা পানির ঢলে বিস্তীর্ণ এলাকার অধিবাসীরা এখন হাহাকার করছে। ধানক্ষেতগুলো পাহাড়ী ঢলে ভেসে গেছে। হাজার হাজার টন মাছ ও জলজ প্রাণী পচে গিয়ে সারা এলাকা এক বিভৎস পূঁতি দূগন্ধময় পরিবেশে মানুষ নি:শ্বাস নিতে পারছে না। লাখ লাখ মানুষের গৃহে খাবার নেই। ধানক্ষেতগুলি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ফসলের মৌসুমে কৃষকের গোলা ধানে ভরে উঠবে না। এখানে সরকারের কোন উদ্যোগ নেই। এমনও শোনা যাচ্ছে যে, এই অকাল বন্যার পানির সাথে উজানের ইউরেনিয়াম খনির বর্জ্য ভেসে আসার ফলে জলজ প্রাণীর মড়ক ধরেছে। এ বিষয়ে সরকার যে তদন্ত করছে তাতে পানি পরীক্ষা ছাড়াই বলা হচ্ছে-পানিতে কোন তেজস্ক্রিয়তা নেই। কারন এই সরকারের কোন তদন্তই জনগণ বিশ্বাস করে না। পার্শ্ববর্তি দেশের সরকার বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের এতোই অকৃত্রিম বন্ধু যে, বাংলাদেশের প্রতি ভারতের যেকোন অন্যায়কেই এরা অন্যায় বলে মনে করে না। পাহাড়ী ঢলে হাওর এলাকায় সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা ঢাকতেই দেশব্যাপী বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে।

পরমাণু শক্তি কমিশনের পরীক্ষার পরও কীসের ভিত্তিতে তেজষ্ক্রিয়তার কথা বলছেন- সাংবাদিকদের এই প্রশ্নে রিজভী বলেন, যেভাবে জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। বন্যার পানিতে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফসলাদির ক্ষয়ক্ষতি হয়, কিন্তু জলজ প্রাণী মারা যায়, এটা কখনও শুনিনি। বিষয়টি পত্র-পত্রিকায় এসেছে, ভারতের ফেইসবুকে এসেছে। আমরা গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে বলছি।সুনামগঞ্জের হাওরে দূষণ পরীক্ষায় পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তা সুনামগঞ্জের হাওরে দূষণ পরীক্ষায় পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তা হাওরের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রিজভী। ধানক্ষেতগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ফসলের মৌসুমে কৃষকের ধান গোলায় উঠবে না। এখানে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই।

রিজভী বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনীতি লুটপাটের ওপর নির্ভরশীল। প্রকাশ্যে দুর্নীতিকে সমর্থন ও আশকারা দিয়েছে বর্তমান ভোটারাবহীন আওয়ামী সরকারের প্রচন্ড ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা। নির্লজ্জভাবে সরকারি ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতকে স্বাভাবিক বলেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী। শেয়ার বাজার থেকে লক্ষ কোটি টাকা আত্মসাৎ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা পাচার, সরকারি ব্যাংকগুলো লোপাট, ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদপুষ্ট ভুয়া কোম্পানীগুলোকে সরকারি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের সুযোগ করে দেয়া এই সরকারের অর্থনৈতিক উন্নতির প্রধান সূচক। এতে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন দুরে থাক, ব্যক্তিগতভাবে আওয়ামী উন্নয়ন হয়েছে, এটি নি:সন্দেহে বলা যায়। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চরম নৈরাজ্যজনক। রেমিটেন্স প্রবাহ কমতে কমতে তলানীতে ঠেকেছে। প্রচন্ড হ্রাস পেয়েছে রপ্তানী আয়। এর সাথে আমদানি ব্যয় বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। তার ওপর মরার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো ডলালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, আর এই কারনে হু হু করে বাড়ছে আমদানি পন্যের দাম। জাতির রাজকোষ লুটপাটের কারনে খালি হয়ে যাওয়ায় এটিকে খানিকটা পূরণের জন্য ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এর চেইন রিএ্যাকশনে সবচাইতে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে তাদের এখন অনেক টাকা ব্যয় করতে হবে।



নিউজপেজ২৪/ এ বি