অর্থনীতি

এপ্রিল ২৯, ২০১৭, ৫:৪৭ অপরাহ্ন

‘ডলারের দাম রাতারাতি বেড়ে যাওয়ার মতো কিছু ঘটেনি’

নিউজপেজ ডেস্ক

ডলারের দাম রাতারাতি দুই থেকে তিন টাকা বেড়ে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। বাজার এভাবে কাজ করে না। কেন এমন ঘটেছে, এটাই এখন দেখতে হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আহমেদ জামাল।

গত সপ্তাহে হঠাৎ দেশের বাজারে ডলারের মূল্যমান বেড়ে যায়। ২৫ এপ্রিল এক ডলার সমান ৮৫ টাকা পর্যন্ত হয়। কেন হঠাৎ ডলারের এই দর বাড়ল, তা নিয়ে আহমেদ জামাল এসব কথা বলেন।

আজ শনিবার প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেডা) সহযোগিতায় এই গোলটেবিল বৈঠকের সঞ্চালনায় ছিলেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। অনুষ্ঠানের শুরুতে বর্তমান মুদ্রাবাজারের বাফেদার ভূমিকা তুলে ধরেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমীন।

আলোচনায় বাংলাদেশের বর্তমান মুদ্রাবাজার অবস্থা, কিসের ওপর বিনিময় হার প্রভাবিত হয়, বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর বিনিময় হারের প্রভাবসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন বক্তারা।

বৈঠকে আহমেদ জামাল বলেন, হঠাৎ মুদ্রাবাজারে অস্থিরতার নিশ্চয় কোনো কারণ আছে। এটা কেন হচ্ছে, তা আমাদের বের করতে হবে। তিনি বলেন, আগে থেকেই এ ধরনের অস্থিরতার বিষয়ে আঁচ করা যায় কি না, সেই পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এসব বিষয়ে নির্ণয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তথ্য ও উপাত্ত ও ইনস্ট্রুমেন্ট খুব বেশি থাকে না। বর্তমানে এগুলো নিয়ে ভাবা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, প্রতিটি ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার আয়-ব্যয় বিবেচনা করে ব্যবসা করা উচিত। না হলে বিনিময় হারে অস্থিরতা তৈরি হবে।

এই বিষয়ে একই কথা বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, হঠাৎ টাকার অবমূল্যায়ন হলো অর্থাৎ ডলারের দাম বেড়ে গেল আবার হঠাৎ কমে গেল—এটা মার্কেট ফোর্সের জন্য হয়নি। অস্থিরতাটা অস্থায়ী। আরও কারণ আছে এর পেছনে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিনিময় হার কমলে রপ্তানি বাড়ে, এ ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। টাকার অবমূল্যায়নে সব সময় রপ্তানি বেড়েছে এমনটা হয়নি। রপ্তানি কতটুকু বাড়বে, প্রতিযোগিতা কেমন বেড়েছে এবং আমদানির অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে বিনিময় হার।

মুদ্রাবাজার পরিস্থিতিতে এত জটিলতার কারণ কয়েকটি বলে সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, যেমন তথ্যের অসামাঞ্জস্যতা; বাজার পর্যবেক্ষণে ঘাটতি রয়েছে মুদ্রাবাজারে। তিনি মনে করেন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ঠিক রাখতে ঝুঁকিবণ্টন-পদ্ধতি বা হেজিং নিয়ে ভাবতে হবে ব্যাংকগুলোকে।

একজন ব্যবসায়ীর কাছে অবিক্রীত মুদ্রা থেকে গেলে এবং বিপৎকালীন সঞ্চয় না থাকলে, এমন অবস্থায় ব্যবসায়ীদের রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা হলো হেজিং। মুদ্রার অনাকাঙ্ক্ষিত ওঠানামার ফলে ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত ঝুঁকির মুখে পড়ে যান। যেহেতু ঝুঁকি কমানো বা প্রতিরোধের কোনো উপায় নেই, সেহেতু প্রয়োজন পড়ে এ ঝুঁকিবণ্টনের। হেজিং হলো এ ধরনের একটি ঝুঁকিবণ্টন-পদ্ধতি।

এদিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার পাইকারি বা হোলসেল কোনো বাজার নেই বলে মন্তব্য করেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হেড অব ফিন্যান্সিয়াল মার্কেট আলমগীর মোর্শেদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের পাইকারি কোনো বাজার নেই। যে যার মতো ব্যবসা করছে। কয়েক বছর ধরে আমাদের মুদ্রাবাজার বেশ স্থিতিশীল ছিল।’

আলমগীর মোর্শেদ সাম্প্রতিক এই অস্থিরতার কারণ হিসেবে কয়েকটি দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক ও বিদেশি ব্যাংক—তিন ধরনের ব্যাংকের তিন ধরনের রেট। এটা একটা অস্থিরতার কারণ। এসব ক্ষেত্রে ব্রোকারেজ হাউস ভালো একটা প্রভাব রাখতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বাজারের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা (মার্কেট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট) নিয়ে ভাবতে হবে। এই বিষয়ে গবেষণা করতে হবে। এ ছাড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমাদের স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে,’ বলে মনে করেন আলমগীর মোর্শেদ।

গোলটেবিল বৈঠকে মুদ্রাবাজারের ওপর রপ্তানির প্রভাব তুলে ধরেন বক্তারা। তৈরি পোশাক-মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের যে অবস্থা, এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে তাতে বলা যায়, রপ্তানি এবার ডিজিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে না। তিনি বলেন, রপ্তানি পণ্য না কমলেও রপ্তানি মূল্য কমেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সব দেশের মুদ্রার একটি অবমূল্যায়ন দেখা গেছে। কেবল বাংলাদেশেরটা ঠিক ছিল।

এ ছাড়া রপ্তানি কমার পেছনে কারণগুলো সম্পর্কে মাহমুদ হাসান বলেন, রপ্তানিতে এখন প্রতিযোগিতা কম, নতুন বিনিয়োগ নেই, প্রচুর নিরাপত্তাবিষয়ক ইক্যুইপমেন্ট আমদানি হচ্ছে, যা সরাসরি উৎপাদনকাজে লাগছে না। যদিও এর সুফল ২০১৮ সাল নাগাদ পাওয়া যাবে বলে মনে করেন তিনি। এ ছাড়া সব শেষ অবকাঠামোগত ঘাটতির কথা তুলে ধরেন তিনি।

এদিকে মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা নিয়ে ভাবার আছে জানিয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদ বলেন, ‘আমাদের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে উন্নয়নের ধারণার মধ্যে আনতে হবে।’ সরকারের মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে মুদ্রাবাজারের সম্পর্ক আছে জানিয়ে তিনি বলেন, নমিন্যাল রেট স্থিতিশীল করে রাখা ঠিক নয়। হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স এলেও তা অর্থনীতিতেই ঢুকছে। বাংলাদেশের মুদ্রা সার্বিকভাবে অতিমূল্যায়িত, তাই এ অবস্থায় নমিন্যাল ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট বিলাসিতা বলে মনে করেন তিনি।

তবে তাঁর এ বক্তব্যের কিছুটা ভিন্নমত দেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স হুন্ডির মাধ্যমে এলে বাংলাদেশের ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভে এর প্রভাব পড়ে না। এ সময় তিনি বলেন, ‘মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে আমাদের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে আসার (ব্রেক্সিট) বিষয়টি নিয়ে এখন ভাবতে হবে। এখন পর্যন্ত এর প্রভাব না পড়লেও, এ বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে।’ এ ছাড়া সন্ত্রাসী অর্থায়নের কারণে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীতে ব্যয় বাড়ছে বলে জানিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সন্ত্রাসী অর্থায়নের কারণে কড়াকড়ি আরোপের ফলে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

গোল টেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এ তাসলিম, জনতা ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুস সালাম এবং অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলী হোসেন প্রধানীয়।



নিউজপেজ২৪/ এ বি