রাজনীতি

মে ৪, ২০১৭, ১০:৪০ পূর্বাহ্ন

বিএনপির তিন প্রস্তাব

নিউজপেজ ডেস্ক

দলীয় সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচন নয় এমন অবস্থানে অনড় থেকে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা তৈরি করছে বিএনপি। এতে একাধিক প্রস্তাবনা দেওয়া হবে, এর যে কোনো একটির অধীনে পরবর্তী নির্বাচন করার আহ্বান থাকবে দলটির।

রূপরেখা তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিএনপির কয়েক নেতা ও থিঙ্কট্যাংক বলছেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সংবিধানের ভেতরে যে বিধান আছে তা মেনে দুটি এবং সংবিধানের বাইরে একটি, মোট তিনটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হবে। এ জন্য সংবিধান পরিবর্তনের আহ্বান জানাতে পারেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপও চাইতে পারেন তিনি।

প্রস্তাবগুলো হলো ১. সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নিয়ে সর্বদলীয় সরকার, ২. স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত যেসব রাজনৈতিক দল সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে তাদের মধ্যে থেকে সর্বদলীয় সরকার এবং ৩. দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য নিরপেক্ষ ও সজ্জন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি নির্দলীয় সরকার। তবে প্রস্তাবনা প্রকাশের আগে তা দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে তোলা হবে। সে সময় এর পরিবর্তনও আসতে পারে।

এ ছাড়া নির্বাচনের সময় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় কার কাছে রাখতে হবে, তার প্রস্তাবও থাকবে এতে। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কার অধীনে থাকবে সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। তারা মনে করেন, এ বিষয়টির সমাধানও আগে হওয়া উচিত।

গত বছরের শুরু থেকেই এ রূপরেখা তৈরি নিয়ে কাজ করছেন দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্যের নেতৃত্বে কয়েকজন থিঙ্কট্যাংক। তবে প্রস্তাবনাগুলো জাতির সামনে তুলে ধরার ‘ক্ষেত্র’ এখনো তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্ষেত্র তৈরি হলেই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারপারসন তা তুলে ধরবেন।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাবনা তৈরির কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে। উপযুক্ত সময়ে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরবেন।

এদিকে আগামী ১০ মে বিকাল সাড়ে ৪ টায় রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘ভিশন ২০৩০’ নামে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করবেন খালেদা জিয়া। ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কী করবে, এতে তা বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। এর আগে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের জাতীয় কাউন্সিলে খালেদা জিয়া এ কর্মপরিকল্পনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।

দলের কয়েকজন নেতা নির্বাচনকালীন সরকারকে সহায়ক সরকার বললেও তা সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন এ রূপরেখা তৈরির কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে নয়, ‘অন্য’ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। এটিই হচ্ছে আমাদের বক্তব্য। এটিকে নির্বাচনকালীন সরকারই বলব আমরা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তুলে বিগত নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। বর্তমান সরকারের অধীনেই ওই নির্বাচন হয়। এরপর নির্বাচনকালীন সরকারকে নির্দলীয় বললেও এখন তার থেকেও কিছুটা সরে এসেছে। দলের শীর্ষ স্থানীয় নেতারা বুঝতে পেরেছেন, বাস্তবতার বাইরে গিয়ে কাজ হবে না। তাই তারা এখন বলছেন, নির্বাচনকালীন সরকার। অর্থাৎ সংবিধানের অধীনে থেকেও দলটি নির্বাচনে যেতে রাজি আছে।

দলের অন্দর মহলের খবর, এখন পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত, যে কোনো পরিস্থিতিতেই নির্বাচনে যাবে বিএনপি। সে রকম প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে। তবে নির্বাচনকালীন বিষয়টি নিয়ে দেশে-বিদেশে জনমত তৈরি করতে চায় দলটি। তাই এ প্রস্তাবনা দেওয়া হবে।

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে পরবর্তী নির্বাচন হবে। এর বিরোধিতা করে আসা বিএনপি বরাবরই বলে আসছে, এ সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তা ছাড়া দলীয় সরকারের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার ব্যাপারে ঘোর আপত্তি রয়েছে দলটির। তাই নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালীকরণের ওপর জোর দিচ্ছে দলটি। গত বছরের ১৮ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে প্রস্তাবাবলী তুলে ধরেন খালেদা জিয়া।

ভিশন-২০৩০ : বিগত কাউন্সিলের বক্তব্যের বেশিরভাগ সময়জুড়ে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরে ‘ভিশন-২০৩০’ কর্মপরিকল্পনার খসড়া উপস্থাপন করেন খালেদা জিয়া। তারা সংকট নিরসন করে দেশ-জাতিকে এগিয়ে নিয়ে সমৃদ্ধ দেশ এবং আলোকিত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে ভিশন-২০৩০ শিরোনামে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন। তিনি বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে পাঁচ হাজার ডলার। এর জন্য বিএনপি বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার দুই অঙ্কের ডিজিটে উন্নীত করার সৃজনশীল ও বুদ্ধিদীপ্ত উদ্যোগ গ্রহণ করবে। এর আলোকে ভবিষ্যতে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হবে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

এ কর্মপরিকল্পনায় ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রীর একক কর্তৃত্ব খর্ব করে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনার কথা বলেছেন। জাতীয় সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করে প্রান্তিক গোষ্ঠী ও নেতৃস্থানীয় পেশাজীবীদের আইনসভায় আনতে চান তিনি। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি গণভোট প্রথা চালু, সব কালা-কানুন বাতিল, দলীয়করণমুক্ত দক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকারও রয়েছে এতে। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের যোগ্যতা ও পদ্ধতি সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন, দুর্নীতির সঙ্গে আপস না করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা ও তদারকি শক্তিশালী করা, সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, দেশের মাটিতে অপর কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাও মেনে না নেওয়ার, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সৌহার্দ্য, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে পরিকল্পনায়।

এ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে সম্পৃক্ত এক নেতা বলেন, এটি প্রকাশের পর একটি পুস্তিকা আকারে সারা দেশে বিতরণ করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। তিনি নিশ্চিত করে বলেন, এটি প্রকাশের পর এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হবে। আমরা রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন আনতে চাই, যার অনেক কিছু থাকবে এ পরিকল্পনায়।

দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে রাজনীতিতে যত নতুন ধারা তার প্রত্যেকটির অগ্রভাগে আছেন বেগম জিয়া। এ কর্মপরিকল্পনাও তার একটি অংশ।


নিউজপেজ২৪/ এ বি