অর্থনীতি

মে ১৩, ২০১৭, ১০:৫৫ পূর্বাহ্ন

মানবসম্পদ উন্নয়ন বড় চ্যালেঞ্জ

নিউজপেজ ডেস্ক

দিন-দিন বাজেটের আকার বাড়ছে। বাড়ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারও। কিন্তু সে হারে মানবসম্পদের উন্নয়ন হচ্ছে না। ফলে প্রতিবছরই দেশে দক্ষ জনশক্তির অভাবে বিদেশিদের কাছে চলে যাচ্ছে বিরাট অঙ্কের টাকা। এ ছাড়া দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে বড় ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে দেশে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কমে যাচ্ছে জনশক্তি রপ্তানি, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় উৎস রেমিট্যান্স অর্জনও রয়েছে চ্যালেঞ্জের মুখে। এই বাস্তবতায় দেশে মানবসম্পদ উন্নয়ন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাই আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের ।

বিভিন্ন সমীক্ষার তথ্য মতে, যে দেশে কারিগরি শিক্ষার হার যত বেশি, সে দেশে মাথাপিছু আয়ও তত বেশি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় কারিগরি শিক্ষা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা হচ্ছে। ফলে ওসব দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ৮ হাজার থেকে ৪৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশে দক্ষ জনশক্তি মাত্র ২ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬৬ ডলার। শুধু জনশক্তির দক্ষতার তারতম্যের কারণে জাতীয় উৎপাদনে ভারতের তুলনায় ৬০ শতাংশ, মালয়েশিয়ার তুলনায় ৪ শতাংশ আর জাপানের তুলনায় মাত্র ১ শতাংশ অবদান রাখতে পারছে বাংলাদেশিরা। অথচ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় জোর দেওয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার জিডিপির হার অনেক বেশি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ যে হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে; সে হারে মানবসম্পদের উন্নয়ন হচ্ছে না। এশিয়ার ১২টি দেশের মধ্যে মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জনে পাকিস্তান ছাড়া সব দেশ থেকে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ মানবসম্পদ উন্নয়নে তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে রয়েছি আমরা। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাকে টেকসই করতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়নে তাই আরও মনোযোগ দিতে হবে। তিনি মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনার কথা জানান।

উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে পাকিস্তান ও কম্বোডিয়া বাদে সব দেশ থেকে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভালো হচ্ছে। ১৯৮০-৮৫ সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সময়ে এ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ ছিল। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৯ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এ ক্রমবর্ধমান হার ধরে রাখতে মানবসম্পদ উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। তবে এটি হতে হবে বাস্তবমুখী শিক্ষার আলোকে। মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষার হার ৬৩ শতাংশ; আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার হার মাত্র ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। মানবসম্পদ সবচেয়ে বড় সম্পদ, অথচ এ সম্পদ উন্নয়নে আমরা পিছয়ে আছি যোগ করেন মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক কমিশনার মো. আরিফ খান বলেন, আমাদের দেশের মাথাপিছু আয় ১৫শ ডলার। ২০২১ সাল নাগাদ এটি বেড়ে ২ হাজার ডলার হবে। মাথাপিছু আয় যত বাড়বে, বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা তত বাড়বে। তত বেশি বিদেশি বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট হবে। দেশের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের দারিদ্র্যসীমার হার অনেক কমেছে, নারী শিক্ষার উন্নতি হচ্ছে। এখন মানবসম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে অর্থনীতি আরও অনেক বড় হবে। উন্নত বিশ্বের তালিকায় আমাদের নাম লেখাতে বেশি দিন লাগবে না। এ জন্য মানবসম্পদের উন্নয়নে আমাদের নজর দেওয়া উচিত।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মাদ আবদুল মজিদ বলেন, আমাদের বাজেটের আকার বাড়ছে, কিন্তু বাস্তবায়নের কোনো পরিকল্পনা নেই। এ জন্য বছর শেষে তা বাস্তবায়ন হয় না। এ জন্য দক্ষতা বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে।

ট্যারিফ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান বলেন, অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ৫১ শতাংশ এডিপির বাস্তবায়ন হয়েছে। এখান থেকেই বোঝা যায় আমাদের পরিকল্পনা সঠিক ছিল না। দেশকে এগিয়ে নিতে মাথা এবং হাতের উন্নয়ন করতে হবে। এ জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে। তৈরি পোশাকশিল্পকে আমাদের রপ্তানির প্রধান উৎস হিসেবে বলে আসছি, এ জন্য আমরা গর্ববোধ করছি। কিন্তু বর্তমানে ২৬ হাজার বিদেশি ম্যানেজার পোশাকশিল্পে কাজ করছে। তারা ৭ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে। আমরা কেন এসব জায়গায় যেতে পারিনি? কারণ আমাদের শিক্ষায় গলদ রয়েছে। আমাদের শিক্ষা ও সক্ষমতার দিকে জোর দিতে হবে। আমাদের যোগ্যতা বাড়াতে হবে। দেশের মূল উদ্দেশ্য উন্নয়ন। আর এজন্য শিক্ষিত ও দক্ষ কর্মকর্তা দরকার। এ জন্য কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। যে দেশের কারিগরি শিক্ষা যত শক্তিশালী, তারা তত শক্তিশালী।


নিউজপেজ২৪/ এ বি