অর্থনীতি

মে ১৮, ২০১৭, ১১:০১ পূর্বাহ্ন

আসছে বিশাল ব্যয়ের নির্বাচনী বাজেট

নিউজপেজ ডেস্ক

২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য বিশাল ব্যয়ের ‘নির্বাচনী’ বাজেট আসছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, অভ্যন্তরীণ ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ধীরগতি, রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা, বিনিয়োগে মন্দা এ রকম বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে সরকার আগামী অর্থবছরের বাজেট দিতে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আয়ে থাকছে বড় ঘাটতি। প্রবৃদ্ধির হার নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গতিও ছিল মন্থর। এই অবস্থার মধ্যেও সরকার বিশাল অঙ্কের বাজেট দিয়ে আরও বড় চ্যালেঞ্জ নিচ্ছে।

নতুন বাজেটে রাজস্ব আদায়েও বড় পরিবর্তন আনছে। আগামী অর্থবছর থেকে সরকার নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। এতে ভ্যাটের হার নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। যদিও এখনো তার নিষ্পত্তি হয়নি। আইনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাটের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এই ভ্যাট মানতে নারাজ। তাদের দাবি এ হার কমাতে হবে। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এখন আলোচনা চলছে। এদিকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে সরকারের আলোচনা অনুযায়ী চলতি অর্থবছর থেকেই এ আইন কার্যকর করার কথা। কিন্ত শেষ মুহূর্তে তা হয়নি। নতুন অর্থবছর থেকে এটি হতে যাচ্ছে।

জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকার আগামী অর্থবছরটি পুরো পাবে। যে কারণে এ বাজেটেই সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের একটি বড় চাপ রয়েছে। এরপরের ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের অর্ধেক বাস্তবায়ন করতে পারবে সরকার। কেননা ২০১৮ সালের ডিসেম্বরেই জাতীয় নির্বাচন। ফলে ওই বাজেটে সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এ কারণে বাজেটে সরকার কোনো পক্ষের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক ও আইএফএফের নানা শর্তও নমনীয়ভাবে বিবেচনায় নিচ্ছে। আবার ভ্যাট আইনের মতো একটি কঠিন আইন বাস্তবায়নের আগে যথাসম্ভব ছাড় দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে সামাজিক উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার বাড়ানোর পরিকল্পনা নিচ্ছে। সরকারের অগ্রাধিকার পাওয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দিকেও বেশি নজর রয়েছে। এসব মিলিয়ে আগামী বাজেটে সরকার একদিকে যেমন জনতুষ্টির চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ব্যবসায়ী, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে একটি আপসমূলক সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে।

বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে পারে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার বাড়ছে ৬৭ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে বৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশের বেশি। বাজেটের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব আয় ও ঘাটতির পরিমাণও বাড়ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মাদ আবদুল মজিদ বলেন, আমাদের বাজেটের আকার বাড়ছে, কিন্তু পুরো বাজেট বাস্তবায়নের কোনো পরিকল্পনা নেই। এ জন্য বছর শেষে তা বাস্তবায়ন হয় না। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারের দক্ষতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

আয়ের চিত্র : বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর থেকে আসবে ২ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট রাজস্বের ৮৫ দশমিক ২২ শতাংশ। নন-এনবিআর থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট রাজস্বের ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। করবহির্ভূত খাত থেকে আসবে ৩২ হাজার কোটি টাকা, যা মোট রাজস্বের ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ। বাজেটে ঘাটতি থাকছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি অর্থায়ন করা হবে অভ্যন্তরীণ উৎস এবং বিদেশি সহায়তা থেকে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস তথা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঘাটতির ৪৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ, সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাবদ ২৫ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা, যা মোট ঘাটতির ২৭ দশমিক ৭২ শতাংশ। এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা ৫৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ও অনুদান ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এটি মোট ঘাটতির যথাক্রমে ৫০ শতাংশ ও ৪ দশমিক শতাংশ।

করবহির্ভূত রাজস্বের মধ্যে লভ্যাংশ ও মুনাফা থেকে সবচেয়ে বেশি আয় হবে। এরপর সুদ বাবদ আয়, রয়্যালটি, প্রশাসনিক ফি, জরিমানা ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত, সেবা, ভাড়া ও ইজারা, টোল ও লেভি, প্রতিরক্ষা, রেলপথ, ডাক ও টেলিকমিউনিকেশন, সরঞ্জামাদি বিক্রি থেকে আয় আসবে। আগামী বাজেটে এনবিআরবহির্ভূত রাজস্ব আদায়ে নতুন খাত থাকছে স্পেকটাম নিলাম। এ খাত থেকে সরকারের বড় অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

ব্যয়ের চিত্র : বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অনুন্নয়ন রাজস্ব ব্যয় ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৬০ দশমিক ২৯ শতাংশ। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনভাতা খাতে ব্যয় হবে প্রায় সাড়ে ৫৭ হাজার কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ভর্তুকি খাতে ব্যয় হবে ২৭ হাজার ৫শ কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের ৬ দশমিক ৬১ শতাংশ। বাকি ব্যয় ধরা হয়েছে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ, পেনশন গ্র্যাচুইটি, প্রণোদনাসহ আনুষঙ্গিক খাতে। পাশাপাশি উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ ব্যয় হবে এ খাতে। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা এবং অন্যান্য ব্যয় ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে নির্বাচনী চমক থাকছে মেগা প্রকল্প। সরকারের ৮ মেগা প্রকল্পেই থাকছে ৩৩ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এজন্য সরকার এ খাতে এবারও বরাদ্দ বাড়াচ্ছে। তবে এবার বাজেটে গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়াবেন বলে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন। এরপর রয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে গুরুত্বের দিক দিয়ে প্রথম দশের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য খাত। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৬ দশমিক ৬১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ভর্তুকির বরাদ্দ রাখা হয়েছে কৃষি খাতে। আগামী বাজেটে এ খাতে ৯ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ঋণ পরিশোধে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা।


নিউজপেজ২৪/ এ বি