অর্থনীতি

মে ২৪, ২০১৭, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ন

বাজেট তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো করছে সরকার

নিউজপেজ ডেস্ক

বাজেট তৈরির একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো করছে সরকার। এতে বাজেটের আকার প্রতিবছর গড়ে ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ বাড়ানো হবে। অগ্রাধিকার দেওয়া হবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়নসহ সমসাময়িক বিষয়কে। একই সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হবে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির হার, অঞ্চলভিত্তিক ও বিশেষ শ্রেণি বা পেশাভিত্তিক উন্নয়ন ব্যবস্থাকে। সমাজের পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীকেও এ প্রক্রিয়ায় স্থান দেওয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি হবে সরকারের মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায়।

এই কাঠামোর আওতায় ফেলে প্রতিবছরই সহজে বাজেট তৈরি করা যাবে। এতে বাজেটে অর্থবরাদ্দের ক্ষেত্রে যেমন স্বচ্ছতা আসবে, তেমনি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা পাবে। একই সঙ্গে সরকার বাজেটে অর্থবরাদ্দের মাধ্যমে কোন খাতে বেশি ফোকাস করতে চাচ্ছে সেটি যেমন দেখা যাবে, তেমনি সরকারের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিও পাওয়া যাবে। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন ভিশনের মাধ্যমে দূর দৃষ্টিভঙ্গির একটি পরিচয় পাওয়া যাবে।

২০০৯-১০ অর্থবছর থেকেই সরকার মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো ব্যবহার করে আসছে। এর আওতায় ওই বছরের বাজেটের সঙ্গে আরও দুটি অর্থবছরের বাজেটেও একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো দিচ্ছে। এই কাঠামোর আওতায় পরবর্তী বাজেটগুলো তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রথম দিকে এটি খুব বেশি অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু গত দুই অর্থবছর ধরে এটি ভালোভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। সরকার আশা করছে, আগামীতে এটি আরও বেশি অনুসরণ করা সম্ভব হবে।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে পরবর্তী আরও দুটি অর্থবছরের বাজেট কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ওই কাঠামো অনুযায়ী আসছে অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার হচ্ছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। আসছে অর্থবছরের বাজেট চলতি অর্থবছরের তুলনায় বাড়ছে ১৯ শতাংশেরও বেশি। এটি সরকারের নির্বাচনী বাজেট হওয়ায় এর আকার বাড়ছে। বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর থেকে আসবে ২ লাখ ৪৮ কোটি টাকা, যা মোট রাজস্বের ৮৫ দশমিক ২২ শতাংশ। নন-এনবিআর থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট রাজস্বের ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। করবহির্ভূত খাত থেকে আসবে ৩২ হাজার কোটি টাকা, যা মোট রাজস্বের ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ। আর বাজেটে ঘাটতি থাকছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি অর্থায়ন করা হবে অভ্যন্তরীণ উৎস এবং বিদেশি সহায়তা থেকে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস তথা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঘাটতির ৪৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাবদ ২৫ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা, যা মোট ঘাটতির ২৭ দশমিক ৭২ শতাংশ। এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা ৫৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ও অনুদান ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা মোট ঘাটতির যথাক্রমে ৫০ শতাংশ ও ৪ শতাংশ।

মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় ২০২১ সালের মধ্যে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত করা এবং দারিদ্র্যের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে যেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপি ৭ দশমিক ২ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ ধরা হয়েছে। এই অনুপাতে খাতওয়ারি বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে।

এই কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্যবিমোচন ও বঞ্চিত এলাকার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

আগামী তিন অর্থবছরের জন্য ইতোমধ্যে সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামো ঠিক করেছেন অর্থমন্ত্রী। এতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এখন থেকে বাজেট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, গত অর্থবছরের বাজেট আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। চলতি অর্থবছরের বাজেটেরও একই অবস্থা। এর মাত্র ৭৮ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে, বাকি ২২ শতাংশই অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে ৯৩ শতাংশ বাজেট বাস্তবায়িত হয়েছিল। আগামী ১ জুন অর্থমন্ত্রী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করবেন, যা প্রায় ৪ লাখ ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার মতো হবে। সেই বাজেট কতখানি বাস্তবায়িত হবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।

তিনি আরো বলেন, দেশে প্রশাসনের দক্ষতা ও সচেতনতার অভাব বাজেট বাস্তবায়নের হারকে পিছিয়ে দিয়েছে। এডিপি বাস্তবায়ন না হওয়া ও সক্ষমতার তুলনায় এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বেশি নির্ধারণ এবং বছর শেষে তা কমিয়ে আনার কারণে বাজেট বাস্তবায়ন হয় না।

আগামী অর্থবছরের বাজেট, বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও সুশাসনের দিকে নজর দিতে হবে বলে মনে করেন মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ বছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়, ভ্যাটহার নির্ধারণের সাথে বিনিয়োগের জন্য বেশ কিছু সমস্যার সমাধান করতে হবে। সমস্যাগুলোর অন্যতম হলো জমির সংকট, গ্যাস-বিদ্যুৎ ঘাটতি, পরিবহন ও বন্দর অবকাঠামো নির্মাণ, দক্ষ শ্রমিকের অভাব। সার্বিকভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সুশাসনের পাঁচ-ছয়টি সূচকে সর্বনিম্ন এক-তৃতীয়াংশ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ আছে।

সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরে বরাবরের মতো শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকবে। এটি মূল শিক্ষা খাতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার পরের হিসাব। এ ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সুদ পরিশোধেও বাড়তি ব্যয় রাখা হচ্ছে, যার পরিমান ক্রমবর্ধমান।

এদিকে আগামী বাজেটের জন্য ৬টি কৌশল নেওয়ার সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এর প্রধান সুপারিশটি হলো গুণমান বজায় রেখে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী করা।

সিপিডির অন্য পাঁচটি সুপারিশ হলো রপ্তানি ও প্রবাস আয় খাতকে সুবিধা দিতে স্বল্পমেয়াদে টাকার মূল্যমান কমানো; প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে সাশ্রয়ী করা; নতুন আইনে মূল্য সংযোজন করের (মূসক) চাপ কমাতে করদাতার ন্যূনতম কর হার কমানো; সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং গুণগতভাবে বাজেট বাস্তবায়নে নীতি সংস্কার করা।


নিউজপেজ২৪/ এ বি