অর্থনীতি

জুন ১, ২০১৭, ১২:১০ অপরাহ্ন

সুদ কমানোর ঘোষণায় সঞ্চয়পত্র কেনার হিড়িক

নিউজপেজ ডেস্ক

ব্যাংকে আমানতের বিপরীতে সুদের হার খুবই কম। তার ওপর নতুন বাজেটে আসছে করের খড়্গ। অন্যদিকে সুদহার বেশি থাকায় বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ লাভজনক। কিন্তু সম্প্রতি সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। আর সুদের হার কমার আগেই সঞ্চয়পত্র কেনার ধুম পড়েছে। গত কয়েক দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল শাখা ও সোনালী ব্যাংকে গ্রাহকদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে।

সূত্র জানায়, গত ২১ মে ঢাকা চেম্বারের নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, সাধারণত ব্যাংক আমানতের সুদের হারের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১ বা ২ শতাংশ বেশি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই ব্যবধান ৪ শতাংশের বেশি। এই পরি¯িতি চলতে থাকলে সরকারের ঋণের বোঝা বেড়ে যাবে বলেই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিলেও সুদ কমানোর কোনো নির্দেশনা এখনো জারি হয়নি। তবে বাজেট পেশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি কমানো হতে পারে এমন আশঙ্কায় সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে ব্যাংক আমানতের সুদের হার ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পের সুদ হার ১১ থেকে ১২ শতাংশের মতো। এখন সুদের হার কমিয়ে দেওয়া হলে আগের হারে মুনাফা মিলবে না। এই আশঙ্কা থেকেই গত কয়েক দিনে সঞ্চয়পত্র বিক্রির হিড়িক পড়েছে বলে জানান ব্যাংকাররা।

কয়েক বছর ধরে ব্যাংকের আমানতের বিপরীতে সুদ ক্রমশ কমছে। অন্যদিকে পুঁজিবাজারের অব¯া ভালো নয়। দ্ইু বছর ধরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির রেকর্ড ছাড়াচ্ছে। বিক্রির লাগাম টেনে ধরতে এর আগে ২০১৫ সালের ১০ মে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদহার গড়ে ২ শতাংশ কমানো হলেও তাতে খুব বেশি কাজ হয়নি সে সময়।

মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ভবনের নিচতলায় গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় ব্যাংকিং সময় শুরুর আগেই সঞ্চয়পত্রের ক্রেতাদের জটলা দেখা যায়। প্রধান ফটক খোলার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের ফরম জমা দেওয়ার ডেস্কে পড়ে যায় লম্বা লাইন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আরও দীর্ঘ হয়।

একজন গ্রাহক জানান, তিনি পরিবার সঞ্চয়পত্র কিনতে এসেছিলেন। আগে দুই লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনা ছিল। আজ আরও এক লাখ টাকার কেনা হয়েছে। শুনছি সুদের হার কমানো হবে। তাই মেয়ের নামে আরও সঞ্চয়পত্র কিনলাম, যাতে ওর পড়ালেখার খরচটা মেটে।

এদিকে ব্যাংকের জমার বিপরীতে আবগারি শুল্ক বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হচ্ছে। একদিকে সুদহার যৎসামান্য অন্যদিকে করহার দ্বিগুণ, এ ছাড়া রয়েছে ব্যাংকের রকমারি সার্ভিস চার্জ। হিসাব করে দেখা গেছে, ব্যাংকে এক লাখ টাকা এক বছর জমা রাখলে যে সুদ পাওয়া যাবে তা দিয়ে কর ও সার্ভিস চার্জের অর্থ পরিশোধ হবে না। সব পাওনা মিটিয়ে গ্রাহক ৯৯ হাজার টাকা ফেরত পাবেন। এই পরি¯িতিতে ব্যাংক জমার অর্থ তুলে এনে সঞ্চয়পত্র কিনছেন অনেক। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ১০ শতাংশ সুদে অর্থ জমা ছিল। এটি গতকাল তুলে এনে সঞ্চয়পত্র কিনেছি।

বাজেট ঘাটতি মিটাতে সরকার বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে যে পরিমাণ অর্থ ধার করার লক্ষ্য ধরেছিল, দশ মাসেই তার প্রায় আড়াইগুণ নিয়ে ফেলেছে। এ অর্থবছরের ১২ মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল সরকার কিন্তু জুলাই-এপ্রিল পর্যন্ত ৪২ হাজার ১০০ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই সরকারকে এই ঋণ বহন করতে হচ্ছে; গুনতে হচ্ছে সুদ। পরি¯িতি সামাল দিতে না পারলে সরকারের বাজেট ব্যব¯াপনা ঝুঁঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে হুশিয়ার করে আসছিলেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিক্রি যেভাবে বাড়ছে সুদের হার কমানো ছাড়া সরকারকে অবশ্যই সুদহার সমন্বয় করতে হবে। কারণ এতে সরকারের বোঝা বাড়ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা। সুদের হার কমানোর পরও বিক্রি না কমায় সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়। অর্থবছর শেষে দেখা যায়, সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ৩৩ হাজার ৬৮৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা ধার হয়েছে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ, পেনশনার সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৭৬, বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ও ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ২৮ এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ সুদ দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে গড়ে ৫ শতাংশ হারে সুদ পাচ্ছেন আমানতকারীরা।


নিউজপেজ২৪/ এ বি