শিক্ষাঙ্গন

জুন ৮, ২০১৭, ১০:৪১ পূর্বাহ্ন

উপবৃত্তিতে দুর্নীতি

নিউজপেজ ডেস্ক

মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে সরকার বিশাল একটা অঙ্ক ব্যয় করছে উপবৃত্তির মাধ্যমে।

তবে এ ক্ষেত্রে একাধিক প্রকল্প হওয়ায় সুযোগ নিচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। কোথাও কোথাও ভুয়া এবং দ্বৈত উপবৃত্তিতে লুটে নেওয়া হচ্ছে সেই অর্থ। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার নির্দিষ্ট ফর্মে স্বাক্ষর করিয়ে শিক্ষার্থীকে দিচ্ছে কম টাকা। সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন উইংয়ের (এমইডব্লিউ) অর্ধ-বার্ষিক পরিবীক্ষণে তিন লাখ ভুয়া উপবৃত্তির তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণে পাওয়া যায়, চার প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ৪১ লাখ ৯ হাজার শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা সরকারের, যদিও বিতরণ করা হয়েছে মোট ৩৪ লাখ ৮৮ হাজার জনকে। সেকায়েপের আওতায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য দেওয়া হচ্ছে পিএমটি উপবৃত্তি। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ১৮ লাখ ৫৩ হাজার, এর মধ্যে ১৫ লাখ ৮৩ হাজার শিক্ষার্থীকে তা বিতরণ করা হয়েছে। তবে এর তিন লাখ উপবৃত্তিই অনাকাক্সিক্ষত বা ভুয়া বলে উল্লেখ করেছে এমইডব্লিউ।

আরেকটি হচ্ছে এসইএসআইপি, এর মাধ্যমে উপবৃত্তি দেওয়ার কথা তিন লাখ ৬৫ হাজার। তবে এ উপবৃত্তি দেওয়া হয়েছে তিন লাখ শিক্ষার্থীকে। এসইএসপি প্রকল্পের আওতায় উপবৃত্তির লক্ষ্যমাত্রা ১৫ লাখ ৮৭ হাজার, যদিও তা বিতরণ করা হয়েছে ১০ লাখ ৮৩ হাজার শিক্ষার্থীর মাঝে। আর এইচএসএসপির আওতায় ছয় লাখ চার হাজার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও উপবৃত্তি পেয়েছে পাঁচ লাখ ২০ হাজার শিক্ষার্থী।

মূলত বেশ কয়েকটি ক্যাটগরির ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয় উপবৃত্তি। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে গড় উপস্থিতি; পিতা-মাতার শিক্ষাগত যোগ্যতা; পরিবারের বার্ষিক আয়; পরিবারে উপার্জনক্ষম লোকের সংখ্যা; নির্দিষ্ট পরিমাণে ভূমির মালিক; ছাত্রীদের ক্ষেত্রে অবিবাহিত হওয়া; পার্বত্য, হাওর ও মঙ্গাপীড়িত এলাকার শিক্ষার্থী; দুস্থ-অসহায় গোষ্ঠী; অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা, উপার্জনে অসমর্থ বা বিকলাঙ্গ বাবা-মায়ের সন্তান ও প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। কিন্তু দেখা গেছে, উল্লিখিত সব শর্ত মেনে উপবৃত্তি বিতরণ হয় না। কারো ক্ষেত্রে, বাবা-মায়ের আয় না থাকলেও নির্ধারিত শর্তের বেশি জমি রয়েছে। আবার সচ্ছল শিক্ষার্থীদেরও অসচ্ছল উল্লেখ করে শিক্ষকরা উপবৃত্তি দিয়েছেন। কোথায়ও দেখা গেছে, স্কুলে না এসে বিবাহিত ছাত্রীরা টাকা উঠাচ্ছে নিয়মিত।

এ প্রসঙ্গে এমইডব্লিউ পরিচালক ড. মো. সেলিম মিয়া আমাদের সময়কে বলেন, অভিন্ন পদ্ধতিতে উপবৃত্তি দেওয়া হলে ভুয়া এবং দ্বৈত শিক্ষার্থী পরিহার ও চিহ্নিতকরণ সম্ভব হবে। আমরা সুপারিশ করেছি শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি বিতরণের ক্ষেত্রে মোবাইল টেকনোলজি ব্যবহার করা হলে প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন এবং উপবৃত্তি বিতরণ ব্যয়ও হ্রাস পাবে।

শিক্ষা খাতে বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি, বাস্তবায়ন সমস্যা ও সুপারিশসহ তৈরি প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাঠ পরিকল্পনা অনুসরণ করে পাঠদান করা হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা কোচিংমুখী ও গাইড বইনির্ভর হয়ে পড়ছে। সেকায়েপ প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত অতিরিক্ত ক্লাস শিক্ষকরা (এসিটি) সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর প্রণয়ন এবং মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে ক্লাস পরিচালনা করতে তেমন দক্ষ নন। ফলে শিক্ষকদের গাইড বই বা নোটনির্ভর হতে দেখা গেছে। এর উজ্জ্বল উদাহরণ হলো রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার চেংমারী মান্দাইন উচ্চ বিদ্যালয়।

সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টম্যান্ট প্রোগ্রাম (সেসিপ) সম্পর্কে বলা হয়েছে, চাকরির অনিশ্চয়তায় সেসিপের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত জনবল প্রত্যাশিত সেবা দিতে ব্যর্থ। তাই এ অনিশ্চয়তা দূরীকরণে পদগুলোকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তাও তাদের দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করছেন না। সমন্বয়হীনতার কারণে মনিটরিং কার্যক্রম প্রত্যাশিত পর্যায়ের হচ্ছে না। এমনকি পরিবীক্ষণের জন্য কর্মকর্তাদের সহযোগিতা চেয়েও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

মাউশির এ প্রতিবেদন সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে মনিটরিং একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রতিবেদনটির সব প্রকল্পের তথ্য একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব হয়েছে। এতে সার্বিক মূল্যায়ন এবং প্রকল্পগুলোর পারফরমেন্স তুলে ধরা হয়েছে। চিহ্নিত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।


নিউজপেজ২৪/ এ বি