অর্থনীতি

জুন ২০, ২০১৭, ১১:২৩ পূর্বাহ্ন

ভ্যাটে বিশাল ছাড়

নিউজপেজ ডেস্ক

নতুন মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আইন আগামী অর্থবছর থেকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সরকার আরও সময় নিচ্ছে। এ জন্য বাজেট পাসের আগে ভ্যাট আইনে বড় ধরনের ছাড় থাকছে। এর মধ্যে রয়েছে হার কমানো, ভ্যাটমুক্ত পণ্য ও সেবার তালিকা বাড়ানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা খাতকে ভ্যাটের আওতামুক্ত করা, খাতভিত্তিক হার কমানো। নতুন আইনে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় যেসব সেবায় ভ্যাট আরোপ করা তার ওপরও এই হার কমানো হবে।

সচিবালয়ে গতকাল মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত বাজেট বিষয়ে আলোচনার জন্য অর্থমন্ত্রী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের মন্ত্রী ও সচিবদের নিয়ে একটি বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব নির্দেশনা দিয়েছেন বলে একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত বাজেটে আরোপিত ভ্যাট ও আবগারি শুল্কের বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নতুন ভ্যাট আইন ও আবগারি শুল্ক বিষয়ে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বাজেট পাসের আগে এসব সমাধান করতে হবে। বাজেটের প্রভাবে যাতে জনমনে কোনো ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখার নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, সরকার বাজেট দিয়েছে জনগণের উন্নয়নে। আর এর কারণে যদি জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হয় তা হলে তো এমন বাজেট সংসদে পাস করা হবে না। বাজেটকে অবশ্যই জনবান্ধব করতে হবে।

সূত্র জানায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জনঅসন্তোষ, ব্যবসায়ীদের তীব্র প্রতিবাদ- এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার নতুন ভ্যাট আইনে বড় ধরনের ছাড় দিতে যাচ্ছে। আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটই শেষ বাজেট, যা এ সরকার পুরো মেয়াদে বাস্তবায়ন করতে পারবে। ফলে এই বাজেটের প্রভাব ২০১৮ সালের শেষের দিকে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের যে বাজেট এই সরকার দেবে তা বাস্তবায়নের সময় পাবে মাত্র ৩ থেকে ৪ মাস। এ সংসদের মেয়াদ শেষ হবে জানুয়ারির প্রথম দিকে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদপূর্তির তিন মাস আগে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ হিসাবে ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

গত ১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করেন। ওই বাজেটে বলা হয়, আগামী অর্থবছরের শুরু থেকে অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করা হবে। এর আগে ২০১২ সালে জাতীয় সংসদে নতুন ভ্যাট আইন পাস করা হয়। এই আইনে কিছু সেবা ও পণ্য ছাড়া প্রায় সব সেবা ও পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের কথা বলা হয়। একই সঙ্গে সব স্তরে এ হারে ভ্যাট দেওয়ার নিয়ম করা হয়। এই আইন বাস্তবায়িত হলে পণ্য আমদানি, উৎপাদন, বিপণন ও বড় বড় দোকানে খুচরা পর্যায়েও ভ্যাট দিতে হবে। এতে ভ্যাটের হার বেশি পড়বে। যে কারণে ভ্যাট রিবেট দেওয়ার নিয়ম করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা সঠিকভাবে হিসাব রাখলে ১৫ শতাংশের অতিরিক্ত ভ্যাটের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। নতুন আইনে গ্যাস, বিদ্যুৎ, চিকিৎসাসেবাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয়।

দেশের ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এ ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন। তারা বলেছেন, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়িত হওয়ার মতো কাঠামো বর্তমানে নেই। এটি চালু হলে সব পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাবে। এর প্রভাবে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও ব্যাপকভাবে বাড়বে। বর্তমানে চালসহ নিত্যপণ্যের দাম এমনিতেই ঊর্ধ্বমুখী। এ অবস্থায় ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে দাম আরও বাড়বে।
ব্যবসায়ীরাও ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন। তারা বলেছেন, ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে যেভাবে হিসাব রাখতে হবে, এ কাঠামো হাতেগোনা কিছু ব্যবসায়ীর রয়েছে, বাকি কারো নেই। ফলে তারা ভ্যাট রিবেট সুবিধা পাবেন না। এ ছাড়া পণ্যের দাম বেড়ে গেলে ক্রেতা কমে যাবে। তখন ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

ভ্যাট আইনটি চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকেই বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের বিরোধিতা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রস্তুতি না থাকায় কার্যকর করা হয়নি। ওই সময়ে সিদ্ধান্ত ছিল আগামী অর্থবছর থেকে কার্যকর করার। এই সময়ের মধ্যে আইটি বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা হবে। কিন্তু ওই সময়ে ব্যবসায়ীদের কিছু প্রশিক্ষণ দেওয়া ছাড়া কিছুই করা হয়নি। নতুন আইন চালু করতে হলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে কমপক্ষে আড়াই লাখ ইসিআর মেশিন দেওয়ার কথা। গতকাল পর্যন্ত ৪ হাজার মেশিন দেওয়া হয়েছে। আগামী ২ বছরে আড়াই লাখ মেশিন দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে এনবিআর।

সূত্র জানায়, বৈঠকে এই বাস্তবতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন এক বছর পেছানো হলো। কিন্তু ব্যবসায়ীদের এ বিষয়ে প্রস্তুত করা হলো না কেন? কাঠামো ঠিক না করেই কেন এই আইন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকরা যে জবাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তা আমলে নেননি। বিষয়টিতে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

সূত্র জানায়, আগামী ২৯ জুন বাজেট পাসের কথা। ঈদের ছুটির কারণে তা একদিন এগিয়ে আনা হয়েছে। আগামী ২৮ জুন বাজেট পাস হতে পারে। এর আগেই ভ্যাট ও আবগারি শুল্কের ব্যাপারে জনবান্ধব সিদ্ধান্ত দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই নির্দেশনা পেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গতকাল থেকেই কাজ শুরু করেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই তারা ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক কাঠামো চূড়ান্ত করবেন।

উল্লেখ্য, আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ভ্যাট থেকে, যা মোট রাজস্বের ৩৬.৮ শতাংশ। মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা।

সুত্রঃ আমাদের সময়

নিউজপেজ২৪/ এ বি