অর্থনীতি

জুন ২১, ২০১৭, ১০:৪৪ পূর্বাহ্ন

বাজেটের হিসাব এলোমেলো

নিউজপেজ ডেস্ক

প্রস্তাবিত বাজেট পাস হওয়ার বাকি আর মাত্র ৮ দিন। সব কিছু ঠিকঠাক। কিন্ত শেষ সময়ে বাদ সাধল নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আইন এবং ব্যাংক হিসাবে জমার ওপর আবগারি শুল্কের হার। আলোচিত দুই ইস্যুতে খোদ প্রধানমন্ত্রীও ক্ষোভ জানিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী, অর্থ সচিব এবং এনবিআর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে আলাদা বৈঠক করেছেন তিনি। সেখানে নতুন ভ্যাট আইনে জনবিরোধী বিষয়গুলো এত দিনেও কেন নিরসন হলো না তা জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া ২০১২ সালে পাস হওয়া আইনটির ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের দাবিগুলোর যৌক্তিক সমাধান না হওয়ার কারণেও ক্ষুব্ধ শেখ হাসিনা।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবারের ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নতুন ভ্যাট আইন ¯গিত করতে বলেছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকে গ্রাহকের জমার ওপর আবগারি শুল্কের হার কমানোর পরামর্শ দেন তিনি।

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পর তারা বাজেটের পুরো হিসাব-নিকাশ নিয়ে বসেছেন। আগের হিসাব এলোমেলো হয়ে গেছে। ফলে এখন নতুন করে আবার হিসাব করতে হচ্ছে। নতুন ভ্যাট আইনের আওতায় এই খাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের এই খাতে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৬৮ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। এর চেয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য নতুন আইনে ২২ হাজার ৫৭৯ কেটি টাকার বেশি ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। কিন্তু নতুন আইন পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না। ফলে তারা এখন বিদ্যমান আইন নিয়েই ভ্যাট আদায় করতে চাচ্ছেন। এই হিসাবে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছু বেশি আদায় হতে পারে। তারপরও এই খাতে ঘাটতি ১৮ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা থাকতে পারে। এই টাকা অন্য খাত থেকে সমন্বয় করতে গিয়ে এনবিআর এখন হিমশিম খাচ্ছে। এ টাকা শুল্ক খাত থেকে আদায় করার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয়ের ঘাটতি মেটাতে বাজেট ঘাটতি বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করছে সরকার। এতেও আবার সমস্যা হচ্ছে যে, ঘাটতি বাড়ালে তা জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি হয়ে যাচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।

সূত্র জানায়, ১ জুলাই থেকে নতুন মূসক আইনটি পুরোপুরিভাবে কার্যকর করা নাও হতে পারে। তবে ভ্যাট আইন ১৯৯১ বহাল রেখে অনলাইন রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। এ সিদ্ধান্ত জানতে ২৮ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বললেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আইন নিয়ে ২৮ জুন বিস্তারিত জানা যাবে। এ বিষয়ে আমি এখন কথা বলব না। কারণ এখন এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা চলছে, যা বলার ২৮ জুন বলব। কিছু অংশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলবেন। কিছু অংশ আমি বলব। তবে আমি বলতে পারি আবগারি শুল্কের হারে কিছু পরিবর্তন আনছি।

অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষকে কোনোভাবেই ভোগান্তিতে ফেলতে চায় না সরকার। তার প্রতিফলন মিলবে বাজেট পাসের সময়। যদিও বাজেট তৈরির সময় এর প্রতিফলন থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাজেটে তার প্রতিফলন নেই।

সূত্র জানায়, নতুন মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আইন আগামী অর্থবছর বড় ধরনের ছাড় দিয়ে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ভ্যাটের হার কমানো, প্যাকেজ ভ্যাট অব্যাহত রাখা, ভ্যাটমুক্ত পণ্য ও সেবার তালিকা বাড়ানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা খাতকে ভ্যাটের আওতামুক্ত করা, খাতভিত্তিক ভ্যাটের হার কমানো। নতুন আইনে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় যেসব সেবার ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে সেগুলোর ওপরও এই হার কমানোর ঘোষণা দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।

জানা গেছে, জনগণের কষ্ট হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না প্রধানমন্ত্রী। বাজেট হতে হবে জনকল্যাণের জন্য। শুধু বাজেটের আকার বাড়িয়ে আর করের বোঝা চাপিয়ে জনগণকে চাপে ফেলার মতো সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যাবে না। ফলে প্রস্তাবিত বাজেটের বিতর্কিত বিষয়গুলোর সমাধান হতে হবে পাসের আগেই। এজন্য নতুন ভ্যাট আইনে জনবিরোধী কী কী আছে তা বের করতে কাজ করছে এনবিআর। ব্যবসাবিরোধী ধারাগুলো বের করে তা পরিবর্তন করা হবে। তবে অনলাইন কার্যক্রম অব্যাহত থাকছে।

এদিকে নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আইনকে বিনিয়োগবান্ধব মনে করছে বিশ্বব্যাংক। সং¯াটির ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, নতুন ভ্যাট আইনের কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে দাম বাড়বে এমন অপপ্রচারে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। সক্ষমতার অজুহাতে ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন পাঁচ বছর পিছিয়েছে সরকার। আর পেছানো ঠিক হবে না। বাস্তবায়ন শুরু হলে সক্ষমতাও গড়ে উঠবে। তার মতে, আবগারি শুল্ক বাড়ানো ব্যাংকিং খাতে সঠিক সংকেত দিচ্ছে না। যখন আমরা আর্থিক ব্যব¯ার গভীরতা ও সম্পৃক্ততা বাড়াতে চাচ্ছি, তখন এই ধরনের ভুল সংকেত দেওয়া হচ্ছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২১ হাজার ১৭ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩১৪ কোটি টাকা বেশি।

আলোচ্য সময়ে ভ্যাট আদায়ে প্রবৃদ্ধি ২৭ শতাংশ। ২০১৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভ্যাট আদায় হয়েছিল ১৬ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা।


নিউজপেজ২৪/ এ বি