অর্থনীতি

জুন ২২, ২০১৭, ১১:৪৪ পূর্বাহ্ন

কোন পথে অর্থমন্ত্রী

নিউজপেজ ডেস্ক

বাজেট ঘোষণার পর থেকেই ঘরে-বাইরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আইন ও ব্যাংকের আমানতে আবগারি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে তোপের মুখে পড়েন। ৮৪ বছর বয়সী অর্থমন্ত্রী এর আগেও নানা ইস্যুতে বেফাঁস মন্তব্য করে সমালোচনার জন্ম দেন। তবে এবার ঢালাওভাবে সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য, এমনকি নিজ দলের মন্ত্রী-সাংসদেরও প্রশ্নবাণে জর্জরিত হচ্ছেন।

সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক হিসাবে ১ লাখ টাকার বেশি স্থিতি থাকলে বছরের যে কোনো সময় আবগারি শুল্ক ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা করা হবে। পাশাপাশি ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ টাকার বদলে ২ হাজার ৫০০, ১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ৭ হাজার ৫০০ টাকার বদলে ১২ হাজার এবং ৫ কোটি টাকার বেশি লেনদেনে ১৫ হাজার টাকার বদলে ২৫ হাজার আবগারি শুল্ক আরোপ করা হবে। এ ছাড়া বাজেটে ব্যাপকহারে ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি এবং ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহত রাখায় ক্ষেপেছেন বেশকিছু মহল। সেই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানোর প্রস্তাবেও আপত্তি উঠেছে।

অর্থমন্ত্রীর এবারের বাজেট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মৃদু সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীর বয়স হয়েছে। বাজেটে যদি কোনো সমস্যা থাকে, তা হলে তার সমাধান করা হবে। এখনো তো বাজেট পাস হয়নি।
বাজেট উপস্থাপনের পর থেকে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ভ্যাটের হার কমানো ও আবগারি শুল্কের হার পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। অর্থ প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও অর্থমন্ত্রী তার অবস্থানে অনড় থাকেন। তিনি বলেন, ভ্যাটের হার ও আবগারি শুল্ক কমানো হবে না।

অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর সংসদে সরকার ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা তীব্র সমালোচনা করেন। কেউ-কেউ তার পদত্যাগ দাবি করেন। এখন পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী পাশে পেয়েছেন শুধু বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে। বাকি সবাই অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন বাজেট আলোচনায়। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ব্যাংক সেবার ওপর আবগারি শুল্কের কর কমানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ভ্যাট আইন পুরোপুরি বাস্তবায়নও পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে অর্থমন্ত্রী যে মূল কাঠামোর ওপর এবারের বাজেট দিয়েছেন সেটি আর থাকছে না। পুরো কাঠামো পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, অর্থমন্ত্রী বাজেট দিয়েছেন ভালো কথা। কিন্তু জনগণের কষ্ট আওয়ামী লীগ মেনে নিতে পারে না। আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার করেন। আপনার কিছু কথাবার্তা সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। আপনি কম কথা বলেন। বয়স হয়ে গেছে, কখন কী বলে ফেলেন।

বাজেটে প্রস্তাবিত ব্যাংক হিসাবে বাড়তি আবগারি শুল্ক ও সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী সংসদে বলেছেন, ব্যাংক আমানতে বাড়তি আবগারি শুল্ক থেকে সরকার কত পাবে? আয় আসবে ২০০ কোটি টাকার মতো। এর জন্য বিপুল লোকের আয় কমিয়ে দেব? তিনি আবগারি শুল্ককে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ বলে মন্তব্য করেন। বাজেট আলোচনায় সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানোর বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদ কমানো ঠিক হবে না।
জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, আপনি বিদায় নিন। পদত্যাগ করুন। সম্মানের সঙ্গে বিদায় নিন। আপনার অনেক বয়স হয়েছে। আপনাকে সম্মান করি। বিদায় নিয়ে ষোলো কোটি মানুষকে মুক্তি দিন। তিনি অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবির পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে মামলা করারও কথা বলেন।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, বাজেট নিয়ে সারা দেশে আলোচনার ঝড় চলছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এটা নির্বাচনী বাজেট নয়। তা হলে অর্থমন্ত্রী কবে নির্বাচনী বাজেট দেবেন? আগামী বাজেট কার্যকর হবে জুলাইয়ে। তখন বর্ষা শুরু হবে। সেপ্টেম্বরে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় গেলে, অক্টোবরে নির্বাচনের তফসিল। এবারই নির্বাচনমুখী বাজেট করা উচিত ছিল। অর্থমন্ত্রী এবার নির্বাচনবিরোধী বাজেট করেছেন।

বাজেট নিয়ে সমালোচনায় বিদ্ধ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পাশে দাঁড়িয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। গতকাল বুধবার প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তোফায়েল আহমেদ সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন সমালোচনা ও বাঁকা কথার জবাব দেন। তিনি বলেন, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ও কাজী ফিরোজ রশীদ যে ভাষায় অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের কাছ থেকে এটা আশা করি না।

সংসদে উপস্থিত বাবলু ও ফিরোজের উদ্দেশে তোফায়েল বলেন, বয়স নিয়ে কথা বলেন, আপনার নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বয়সের কথা বিবেচনা করেন না, যিনি আপনাকে মহাসচিব বানান, তারপর আবার রুহুল আমিন হাওলাদারকে বানান, যার বয়স অর্থমন্ত্রীর চেয়েও ৫ বছর বেশি। বাবলু আমার খুব প্রিয় লোক। তার মামাশ্বশুর তার নেতা এরশাদ। তিনি কী করে ভুলে গেলেন যে তার নেতার বয়স ৮৬ বছরের বেশি। তিনি যদি বলতেন এরশাদ আপনি পদত্যাগ করেন, বয়স হয়েছে...।

তোফায়েল বলেন, একজন সম্মানিত মানুষকে সম্মান দিতে হয়। বাবলু (মুহিতকে) বলেছেন, ‘এখন বিদায় হন’। উনি আপনাদেরও অর্থমন্ত্রী ছিলেন। উনি ১২টা বাজেট দিয়েছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে আরও দেবেন। উনার ওপর প্রধানমন্ত্রীর আস্থা আছে।

বাজেট নিয়ে মন্ত্রীদের সমালোচনা প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, অর্থমন্ত্রী বাজেট দিয়েছেন। এই বাজেট কেবিনেট অনুমোদিত। কথা থাকলে এমপিরা বলতে পারেন। এটা প্রস্তাবিত বাজেট।

সমালোচকদের উদ্দেশে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন কেন? আমারও পদত্যাগ দাবি করতে পারেন। আমিও এর অংশ। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যদি কোনো সমস্যা থাকে, করের বোঝা আসে, তিনি সেগুলো দেখবেন। আলোচনা অবশ্যই করবেন। বাজেট কি শুধু নেগেটিভ? এর পজেটিভ দিক নেই?

এদিকে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সরকারে ও দলে ক্ষোভ থাকলেও শিগগিরই মন্ত্রিত্ব হারানোর আশঙ্কা নেই মুহিতের। দুর্নীতির অভিযোগ না থাকা এবং বিশ্বমন্দা ও প্রতিকূল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে ভূমিকা রাখায় প্রধানমন্ত্রীর গুডবুকেই আছেন।

আওয়ামী লীগের আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেট পেশের পর অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা মূলত আওয়ামী লীগেরই ‘গেইম’। বাজেট আলোচনা প্রাণবন্ত করার জন্য এবং সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাদের মধ্যে জমজমাট বিতর্ক সৃষ্টির লক্ষ্যেই এই আলোচনায় তেমন একটা আপত্তি করেননি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতা দেওয়ার সময় আবগারি শুল্ক, সঞ্চয়পত্র ও ভ্যাটের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন। মূলত বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা তার প্রস্তাবিত বাজেট পরিমার্জন করার ‘গ্রাউন্ডওয়ার্ক’ ছাড়া কিছুই নয়।

সরকারের উচ্চ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে কোনো তদবির নিয়ে এসে সুবিধা করতে পারেন না সরকারি দলের অন্য মন্ত্রী ও এমপিরা। কোনো কোনো এমপি তদবির নিয়ে কখনো কখনো অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়েও পাননি। এ কারণে অনেক মন্ত্রী ও এমপিদের ক্ষোভ রয়েছে অর্থমন্ত্রীর ওপর।

বেশ কয়েক বছর আগে অর্থমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদ থেকে সরে যেতে চেয়েছিলেন। পদত্যাগপত্র লিখে সইও করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নিজের দপ্তরে ডেকে পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। সে সময় সরকারের প্রভাবশালী এক মন্ত্রী মুহিতের বাসায় গিয়ে তাকে নিবৃত করেন। বিষয়টি জানার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডেকে নিয়ে মুহিতকে পদত্যাগ না করার অনুরোধ করেন। এবার অবশ্য সে রকম কিছু না ঘটলেও আলোচনায় রয়েছে বিষয়টি।

সূত্রঃ আমাদের সময়

নিউজপেজ২৪/ এ বি