সারাদেশ

জুলাই ৮, ২০১৭, ১১:০৫ পূর্বাহ্ন

বাড়ছে দুর্ভোগ রোগব্যাধি

নিউজপেজ ডেস্ক

ব্রহ্মপুত্র নদ এবং যমুনা ও পদ্মা নদীর পানি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে ধীরগতিতে কমছে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি। ফলে দেশের পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলের জেলা সিলেট, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার ও বান্দরবানে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে উত্তরের জেলা বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও মধ্যাঞ্চলের জেলা জামালপুরে। গতকাল জামালপুরে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ১৯ সেন্টিমিটার, বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার ও সিরাজগঞ্জে বিপদসীমার ৮ ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কুড়িগ্রামে ছুঁই ছুঁই করছে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি। এ তিনি জেলায় এরই মধ্যে প্লাবিত হয়েছে কয়েক শতাধিক গ্রাম। প্রতিদিনই তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। এরই মধ্যে জামালপুরে ভেঙে গেছে বাঁধ। সিরাজগঞ্জে মানুষ আছে যমুনা নদীর ভাঙন আতঙ্কে। কুড়িগ্রামে পানিবন্দি হয়ে আছে লক্ষাধিক মানুষ।

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে বন্যার পানি নামতে থাকলেও রেখে যাচ্ছে ব্যাপক ক্ষতচিহ্ন, বেড়েই চলেছে জনদুর্ভোগ। পানি ধীরে ধীরে নামার কারণে বন্যাকবলিত অঞ্চলে দেখা দিয়েছে পানিবাহিত নানা রোগ। খাদ্য সংকটে চরম বিপাকে আছে দুর্গত মানুষ। সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ ও বিতরণের কথা বলা হলেও দুর্গত এলাকার জনপ্রতিনিধিরা ত্রাণ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। গঙ্গা-পদ্মা নদ-নদীগুলোর পানি সমতল বৃদ্ধি পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আগামী ২৪ ঘণ্টা সুরমা এবং কুশিয়ারা নদীর পানি কমতে পারে।

গতকাল বাসসের খবরে বলা হয়, দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় শুরু হওয়া মৌসুমি বন্যা প্রবল রূপ ধারণ করায় সরকার দুর্গত এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করেছে। এরই মধ্যে সরকার দেড় হাজার টন চাল, নগদ ৪৪ লাখ টাকা ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দিয়েছে। পাশাপাশি, বন্যাপ্রবণ ২১ জেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় দুহাজার একশ টন চাল ও আগাম ৪২ লাখ টাকা বিতরণ করেছে।

এ ব্যাপারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব শাহ কামাল বলেন, সিলেট, মৌলভীবাজার এবং কক্সবাজারের মতো জেলাগুলো বন্যাকবলিত হয়ে পড়ায় আমরা ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি এবং বন্যার পানি নেমে যাওয়া পর্যন্ত এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

জামালপুর : বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে শুক্রবার যমুনার পানি বিপদসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি ৩১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। পানির তোড়ে ভেঙে গেছে যমুনার ৪শ কোটি টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত উলিয়া হার্ডপয়েন্ট এলাকার যমুনা ভাঙন রোধের এমআরসি প্রকল্পের পাইলিং বাঁধ। তলিয়ে যাচ্ছে দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বসতভিটা, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম এহছানুল মামুন জানিয়েছেন, বন্যা মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বগুড়া : বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর পানি শুক্রবার বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ফলে ছয়টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম এবং ১৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন করে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। ইতোমধ্যে সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। পানিবন্দি লোকজন বসতবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছে। পানি বৃদ্ধির কারণে নিম্নাঞ্চলের এক হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আমিন জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি আরও ২৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, উপজেলার প্রায় ১ হাজারের অধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, বেশকিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ায় দুর্গত মানুষের জন্য ৫০ টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। দুর্গতদের তালিকা প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে। তালিকা সম্পন্ন হলে বরাদ্দকৃত চাল বিতরণ করা হবে।

সিলেট : সিলেটে বন্যাকবলিত এলাকায় পানি কমছে। তবে তা খুবই ধীরগতিতে। সুরমা ও কুশিয়ারার নদীর ৪ পয়েন্টে গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত পানি কমেছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড নিশ্চিত করেছে। প্লাবিত এলাকার ধীরগতিতে পানি কমতে থাকায় দুর্ভোগ কমছে না পানিবন্দি মানুষের। ফলে বন্যা পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম আমাদের সময়কে জানান, গত বৃহস্পতিবার থেকে পানি কমছে, তবে তা খুবই ধীরগতিতে।

সিলেট আবহাওয়া অফিসের উপপরিচালক আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেন, সিলেটে বৃষ্টিপাত কমছে। আগামীতে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা নেই।

সিলেটের সিভিল সার্জন হিমাংশু লাল রায় বলেছেন, বন্যাদুর্গত দক্ষিণ সুরমা, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও জকিগঞ্জের মোট ২৪টি ইউনিয়নে চিকিৎসা সেবায় কাজ করছে ৭৮টি মেডিক্যাল টিম।

কক্সবাজার : কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে। গতকাল থেকে বৃষ্টি কমে যাওয়ায় পানি নামছে, তবে এখনো জেলার ৭১টি ইউনিয়নের ২৫টি ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম পানির নিচে। এসব এলাকার চিংড়িঘের, রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে রয়েছে দুর্গত মানুষ।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, ইতোমধ্যে দুর্গত এলাকায় নগদ ৪ লাখ টাকা, ৩৩ চাল খাদ্যসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কুড়িগ্রাম : ব্রহ্মপুত্রসহ সব কটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ পর্যন্ত আড়াই শতাধিক চরগ্রাম প্লবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২৫ হাজার পরিবারের প্রায় ১ লাখ মানুষ।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীতে ৬ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদের নুনখাওয়া পয়েন্টে দশমিক ১৭ সেন্টিমিটার ও চিলমারী পয়েন্টে দশমিক ১৬ সেন্টিমিটার এবং কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তায় ৪১ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। এদিকে বিভিন্ন এলাকায় ভাঙা বাঁধের ২২ কিলোমিটার উন্মুক্ত অংশ দিয়ে লোকালয়ের দিকে পানি ঢুকছে।


নিউজপেজ২৪/ এ বি