সারাদেশ

জুলাই ১১, ২০১৭, ১১:১১ পূর্বাহ্ন

এমপি প্রার্থী হতে গণসংযোগে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা

নিউজপেজ ডেস্ক

দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পার না হতেই হতাশ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা। তাই এখনই বিকল্প ভাবতে শুরু করেছেন তাদের অনেকে। বেশিরভাগ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। তাদের অনেকেই এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। গণসংযোগও করছেন নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায়। বিভিন্ন সূত্রমতে জানা যায়, অন্তত ৩১ জন রয়েছেন এ তালিকায়। স্থানীয় এমপিদের সঙ্গে এ নিয়ে দ্বন্দ্বও দেখা দিয়েছে কয়েকজনের। দূরত্ব তৈরি হয়েছে এমপি-ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের সঙ্গে।

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপসচিব কিংবা ডিসিদের চেয়ে বেশি মর্যাদার স্বপ্ন নিয়ে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের দায়িত্বে বসে এখন দুঃস্বপ্ন দেখছেন তারা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে কাক্সিক্ষত বরাদ্দ নেই তাদের। ছয় মাস অতিবাহিত হলেও পাননি নিজস্ব মর্যাদা। ক্ষমতার সীমা-পরিসীমাও পরিষ্কার হতে পারছেন না। যদিও প্রধানমন্ত্রী জেলা চেয়ারম্যানদের সর্বোচ্চ মর্যাদাদান ও জেলার উন্নয়ন কার্যক্রম তাদের হাত দিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু উপযুক্ত সম্মান, মর্যাদা বা উন্নয়নমূলক কাজ না পাওয়ায় জাতীয় নির্বাচনের দিকে ঝুঁকছেন তারা।

কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. জাফর আলী। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সাবেক এমপিও তিনি। গত ঈদুল ফিতর থেকে টানা নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। কুড়িগ্রাম-২ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য একমাত্র প্রার্থীও তিনি। তার পক্ষে গণসংযোগ করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। আসনটিতে বর্তমান এমপি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম।

নির্বাচনী প্রচারের বিষয়ে জাফর আলী আমাদের সময়কে বলেন, আগে এমপি থাকাবস্থায় যে হারে জনসেবা করতে পেরেছি, তা এখন পারছি না। যেটুকু করছি, নিজ উদ্যোগে। তিনি বলেন, জনগণ আবারও আমাকে এমপি হিসেবে দেখতে চায়। তারা প্রচার চালিয়ে দিয়েছে। সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ আসনটিতে আমাকে মনোনয়ন দিলে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবে। তবে জেলা পরিষদ ছেড়ে এমপি নির্বাচনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান। সাবেক এমপি ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন তিনি। এবার তিনিও এমপি নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাইবেন। এ বিষয়ে আজিজুর রহমান বলেন, আমাদের নির্বাচিত করে যে স্থান সভানেত্রী দিয়েছেন তার জন্য ধন্যবাদ। তবে ঘোষিত মর্যাদার এখনো প্রতিফলন ঘটেনি। এমপিদের সঙ্গেও একটা সাংঘর্ষিক ব্যাপার আছে। দলীয় সভানেত্রী চাইলে আমি নৌকা প্রতীকে সংসদ নির্বাচন করব। তবে এটি তার (শেখ হাসিনার) এখতিয়ারের ওপর নির্ভর করবে। তার নির্বাচনী আসন মৌলভীবাজার ৩-এ বর্তমান এমপি মরহুম সৈয়দ মহসীন আলীর সহধর্মিণী সৈয়দা সায়রা মহসীন।

একইভাবে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এমএ সালাম চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী। এ আসনের বর্তমান এমপি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।
খুলনা-১ (বটিয়াঘাটা ও দাকোপ উপজেলা) আসনে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হারুনুর রশীদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গণসংযোগ করছেন। এ আসনে বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের পঞ্চানন বিশ্বাস।

বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান টুকু লড়তে চান বাগেরহাট-২ (সদর ও কচুয়া) থেকে। অ্যাডভোকেট মীর শওকত হোসেন বাদশা আসনটিতে সংসদ সদস্য হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

সাতক্ষীরা-২ (সদর) আসনে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম এমপি প্রার্থী হিসেবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। এ আসনে বর্তমান এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবি।

নড়াইল-২ (লোহাগড়া ও সদরের বাকি অংশ) আসনে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন বিশ্বাস একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। এ আসনে বর্তমান এমপি ওয়ার্কার্স পার্টির এসকে হাফিজুর রহমান।

চুয়াডাঙ্গা-১ (আলমডাঙ্গা ও চুয়াডাঙ্গা সদরের কিছু অংশ) আসনে জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য শামসুল আবেদীন খোকন প্রার্থী হতে চান। আসনটির বর্তমান এমপি জাতীয় সংসদের হুইপ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন।

সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসন থেকে নির্বাচন করতে গণসংযোগ করছেন সাবেক মন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ বিশ্বাস। এ আসনে বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের আব্দুল মজিদ ম-ল।

ঠাকুরগাঁও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক কোরাইশী লড়তে চান ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসন থেকে। এ আসনে বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন।

ঢাকা-১ (দোহার ও নবাবগঞ্জ) আসন থেকে ঢাকা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গণসংযোগ করছেন। এ আসনে বর্তমান এমপি জাতীয় পার্টির সালমা ইসলাম।

গাজীপুর-৫ (কালীগঞ্জ) আসনে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। এ আসনে বর্তমান এমপি মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি।

রাজবাড়ী-১ (সদর ও গোয়ালন্দ) আসনে রাজবাড়ী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফকির আবদুল জব্বার এমপি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আসনটির বর্তমান এমপি কাজী কেরামত আলী।

বরিশাল-৪ আসনের এমপি ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ নাথের সঙ্গে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মঈদুল ইসলামের বিরোধ চরমে। এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও গ্রুপিংয়ের কারণে মাঝেমধ্যেই দুজনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। আসনটিতে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গণসংযোগ করছেন জেলা চেয়ারম্যান মঈদুল ইসলাম।

দ্বন্দ্ব-কোন্দল ও বিভাজন সৃষ্টির অভিযোগ তুলে শেরপুর জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হুমায়ন কবীর রুমানের বিরুদ্ধে সংসদে কথা বলেছেন সরকারদলীয় হুইপ আতিউর রহমান আতিক। আতিউর রহমানের নির্বাচনী আসন শেরপুর-১ থেকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হুমায়ন কবীর রুমান নির্বাচন করতে আগ্রহী বলে শোনা যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৬১ জেলা পরিষদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি (অন্তত ৩১ জন) চেয়ারম্যান আগামী সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করতে গণসংযোগ করছেন। এলাকা ঘুরে তারা সাধারণ মানুষের কাছে ভোট প্রার্থনা করছেন। সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- তুলে ধরার পাশাপাশি নিজের কর্মদক্ষতার কথাও বলছেন। সব ঠিক থাকলে আগামী নির্বাচনে চাওয়া-পাওয়ার হিসাবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে শক্ত প্রার্থী হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করতে এখন থেকেই কাজ করে যাচ্ছেন জেলা পরিষদে স্বপ্নভাঙা আওয়ামী লীগ নেতারা।
তবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন ও দলটির নীতিনির্ধারকদের একজন আমাদের সময়কে জানান, জেলা পরিষদ নির্বাচনে যাদের দলের মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচিত করা হয়েছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তাদের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।


নিউজপেজ২৪/ এ বি