অর্থনীতি

জুলাই ১২, ২০১৭, ১১:২২ পূর্বাহ্ন

শতকোটি টাকার খেলাপি আরও ১২০ কোটির পাঁয়তারা

নিউজপেজ ডেস্ক

রূপালী ব্যাংকের কাছ থেকে ১০৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল জাপান-বাংলাদেশ (জেবি) সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পেপার্স লিমিটেড। সেই ঋণ এখন মন্দমানের খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। সেই ঋণ পরিশোধ না করে উপরন্তু আরো ১২০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পায়তারা কষছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সেলিম প্রধান। কিন্তু খেলাপি হলে নতুন করে ঋণ নেওয়া সম্ভব নয়। তাই কৌশলে আগের খেলাপি ঋণকে নিয়মিত বা চলমান ঋণ হিসেবে প্রদর্শন করতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে পুণঃতফসিলের। সেই আবেদন ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে এখন প্রস্তুত বোর্ডসভায় অনুমোদনের জন্য। একদিনে খেলাপি ঋণ নিয়মিত ঋণ হিসেবে অনুমোদন পাবে, অন্যদিকে একই বোর্ডে নতুন ঋণপ্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। এ জন্য লবিং চলছে প্রতিষ্ঠানটির এমডি সেলিম প্রধানের।

জাতীয় সংসদে সম্প্রতি শীর্ষ একশ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। সেই তালিকায় ৮৫ নম্বরে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। নিয়ম অনুযায়ী খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও এ প্রতিষ্ঠানকে আরও ১২০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার আয়োজন করেছে রূপালী ব্যাংক। ওই প্রতিষ্ঠানটি আগের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে ১৫ বছরের জন্য নিয়মিত করা এবং আরও অন্তত ১২০ কোটি টাকা চেয়ে রূপালী ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছে। পুনঃতফসিল করা এবং নতুন করে ঋণদানের বিষয়টি অনুমোদনের জন্য বোর্ডের কাছে পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

নিয়ম অনুযায়ী, কোনো খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ নেই। জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস ৫ বছর ধরে খেলাপি। রূপালী ব্যাংকের লোকাল অফিস থেকে ২০০৯ সালে ঋণ নিয়ে ২০১২ সাল থেকে খেলাপি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটি। গত ৫ বছরে কিস্তি পরিশোধ না করে এখন ডাউন পেমেন্ট ছাড়া তিন বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরের জন্য নিয়মিত করার আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের কাজ সম্পন্ন করে বোর্ডের কাছে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিষ্ঠানের মালিক অনেক প্রভাবশালী। এ কারণে তিনি কোনো টাকা না দিয়েই বোর্ড পর্যন্ত প্রস্তাব নিয়ে যেতে পারছেন। তবে ওই প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা করার অনেক সুযোগ রয়েছে।
কয়েকদিন আগে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আজ বুধবার বোর্ডসভায় প্রস্তাবটি পাঠানোর বিষয়ে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ সংক্রান্ত প্রস্তাব এমডি কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এমডি অনুমোদন দিলে তা পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হবে। তবে গতকাল পর্যন্ত খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এমডি বিষয়টির অনুমোদন দেননি। ফলে ওই প্রস্তাব আর আজকের বোর্ডে উঠছে না।

এ বিষয়ে কথা হয় রূপালী ব্যাংকের এমডি আতাউর রহমান প্রধানের সঙ্গে। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার সুযোগই নেই। এ ধরনের কোনো প্রস্তাব কালকের (আজকের) বোর্ডে তোলা হচ্ছে না। আমরা ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির এমডি সেলিম প্রধান বলেন, পুনঃতফসিল ও নতুন করে ঋণ চেয়ে আবেদন করেছি। শুনেছি কালকের বোর্ডে বিষয়টি ওঠানো হচ্ছে না। তবে ওই ব্যাংকের কারণেই ৬ বছর ধরে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে করা অন্যায়ের কারণেই পুনঃতফসিল ও নতুন করে ঋণ দিতে হবে।

রূপালী ব্যাংক তাদের অনুমোদিত সীমার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ঋণ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। সুদে-আসলে এখন পাওনা দাঁড়িয়েছে ১০৮ কোটি টাকা, যা মন্দমানের খেলাপি ঋণ হিসেবে তালিকাভুক্ত। ঋণের টাকা ফেরত না দিয়েই ৩ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করে নিয়মিত করার আবেদন করেছে গ্রুপটি। তবে গ্রুপের এমডি সেলিম প্রধান দাবি করেছেন, তার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে রূপালী ব্যাংকের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তারা ঋণের টাকা নয়-ছয় করেছেন। অর্থমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে তিনি রূপালী ব্যাংকের অন্যায় সম্পর্কে অবহিত করেছেন বলে জানান।

জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারস লিমিটেড ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে জাপান ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে। ২০০৯ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের চেক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদসহ বিভিন্ন নিরাপত্তাসামগ্রী ছাপা শুরু করে। ২০০৯ সালের ২৯ অক্টোবর রূপালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখা থেকে মেয়াদি, সিসি হাইপো, ঋণপত্রসহ বিভিন্নভাবে ৪৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ঋণ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এ সময় প্রাইম ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় প্রতিষ্ঠানটির ঋণ ছিল ১০ কোটি টাকা। বর্তমান প্রতিষ্ঠানটির কাছে রুপালী ব্যাংকের পাওনা ১০৮ কোটি টাকা। ঋণ নেওয়ার পর পরই গ্রুপটি খেলাপি হয়ে যায়। এ পর্যন্ত মাত্র ৫-৬ কোটি টাকা কিস্তি পরিশোধ করেছে। এখন আবার ঋণ নেওয়ার জন্য রূপালী ব্যাংকে চলছে ঘোরাঘুরি। সরকারের প্রভাবশালীদের মাধ্যমে তদবিরও করা হচ্ছে।

ব্যাংক সূত্র জানায়, ঋণের টাকা ফেরত না দিয়ে আগের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের চেষ্টা করছেন সেলিম প্রধান। সরকারদলীয় প্রভাবশালী এক সংসদ সদস্যের তদবিরে তার পুনঃতফসিল প্রস্তাব বোর্ডে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্যাংক। আজ রূপালী ব্যাংকের বোর্ডে বিষয়টি ওঠানোর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আর তা হচ্ছে না। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় আগামী বোর্ডসভায় বিষয়টি ওঠানো হবে। বোর্ড অনুমোদন দিলে তার ঋণ নিয়মিত হবে এবং তিনি নতুন করে আরও ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

এদিকে ব্যাংকে পাঠানো গ্রুপটির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মুলতবি ও অনারোপিত সুদ মওকুফ করে ৩ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরের জন্য নতুন পরিশোধ সূচি নির্ধারণ করে দিতে হবে।

এ ছাড়া প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করার জন্য মেয়াদি ঋণের সীমা ৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০ কোটি টাকা, ঋণপত্র (এলসির) লিমিট ৩ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ কোটি এবং ব্যাংক গ্যারান্টি ৭৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ কোটি টাকা পুনর্নির্ধারণের আবেদন করেছে। এ ছাড়া সিসি হাইপোতে অতিরিক্ত আরও ৪০ কোটি টাকা ঋণ চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

অনুমোদিত সীমার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি ঋণ দিয়েছে রূপালী ব্যাংক। মোট ঋণসীমা ৬২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা হলেও প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ঋণ ১০১ কোটি টাকা। সিসি হাইপোতে প্রতিষ্ঠানটির সাড়ে ৪৯ কোটি টাকার সীমার বিপরীতে ৯১ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত ঋণসীমার অতিরিক্ত ঋণগুলো সুদবিহীন পৃথক অ্যাকাউন্টে রেখে ৩ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরের জন্য পরিশোধ করার সুযোগ চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, ঋণ নিয়মিত করার জন্য আগে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বর্তমান অবস্থায় আর ডাউন পেমেন্ট দেওয়া সম্ভব নয়।

সেলিম প্রধান আমাদের সময়কে বলেন, কারখানা করার জন্য বিদেশ থেকে অর্থ এনেছি। কিন্তু রূপালী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি ফরিদ উদ্দিনের অনুরোধে তাদের ওই অর্থ দিই। ওই টাকা আমানত রাখার শর্ত হিসেবে আমার জাপানি বন্ধু দুই বছরের অগ্রিম সুদ চায়, যেটি দিতে ব্যাংক রাজিও হয়। কিন্তু ব্যাংক আমার অজান্তেই সিসি হাইপোর ঋণ থেকে ওই টাকা পরিশোধ করে। এটি অন্যায়। ওই টাউট এমডির কারণে ৬ বছর ধরে আমি চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছি।

তিনি বলেন, রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অন্যায় এবং তাদের কারণে প্রতিষ্ঠানটির নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, অর্থ সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এবং রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বাঁচানোর পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেছি।

ঋণ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এমন একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করব, যা এশিয়া মহাদেশের কোনো দেশে নেই। পরিকল্পনার মাত্র ১০ ভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। এখনও অনেক টাকা ঋণ লাগবে। আগের ঋণের টাকা আমি পাইনি। যারা দিয়েছেন তারাই নিয়েছেন। আগের এমডি ফরিদ উদ্দিনের লোকরা এসব টাকা নিয়েছেন। তাহলে আমি টাকা ফেরত দেব কেন?

এদিকে কোম্পানি প্রতিষ্ঠার জন্য সেলিম প্রধানের জাপানি বিনিয়োগকারী বন্ধু ইউতাকার কাছ থেকে ১ কোটি ২৫ লাখ ডলার বৈদেশিদ মুদ্রা দেশে নিয়ে আসেন। স্থানীয় মুদ্রায় ১০৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকার রূপালী ব্যাংকের ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদে মেয়াদি আমানত রাখা হয়। বিনিয়োগকৃত অর্থের বিপরীতে লভ্যাংশ চেয়েও পাননি ইউতাকা। শেষ পর্যন্ত তার বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত চেয়ে মামলা করেছেন বাংলাদেশের আদালতে। বর্তমান মামলাটি বিচারাধীন। তাই ওই অর্থও আটকা রয়েছে।

সেলিম প্রধান বলেন, বর্তমান সরকারের একমাত্র অনুমোদিত বেসরকারি সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস এটি। একে বাঁচানোর দায়িত্ব সরকারের। আমার সঙ্গে রূপালী ব্যাংকের অন্যায় আচরণ ও ঋণসংক্রান্ত বর্তমান সমস্যা নিয়ে গত ২০ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মনিরুজ্জামান ও গ্রুপের চেয়ারম্যান শেখ ফজলুর রহমান মারুফও উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে সুদ মওকুফ, পুনঃতফসিল ও নতুন করে আরও ঋণের আবেদন জানাই আমরা।

ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সেলিম প্রধানের বক্তব্যে জানা যায়, ৪টি সহযোগী (সিস্টার কনসার্ন) কোম্পানি নিয়ে ১৯৯৬ সালে জাপান-বাংলাদেশ গ্রুপের যাত্রা শুরু। বর্তমানে সহযোগী কোম্পানির সংখ্যা ১১। এর মধ্যে রয়েছে প্রধান বিউটি কেয়ার, জেবি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেল, জেবি এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, এসপি ফিশিং নেট, জেবি ট্রেডিং করপোরেশন, জেবি সিকিউরিটি সার্ভিস, জেবি টোনার ম্যানুফ্যাকচারিং, জেবি এনটারটেইনমেন্ট, জেবি আইটি সলিউশন ও অ্যাসেট ডেভেলপমেন্ট।


সুত্রঃ প্রথম আলো

নিউজপেজ২৪/ এ বি