সম্পাদকীয়

নভেম্বর ১৩, ২০১৩, ৩:৪১ অপরাহ্ন

দয়া করে জনগণকে রেহাই দিন

নিউজ পেজ ডেস্ক

-মার খেতে পারো?
-না।
-বেঁধে পেটালে?
-যত ইচ্ছা।
প্রচলিত একটি প্রবচন এটি। সার কথা-জিম্মিদশা আর অসহায়ত্বের শিকার হলে সব নির্মমতাই মুখ বুজে হজম করতে বাধ্য হয় মানুষ। এখন দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষই এমন অসহায়ত্বের ভেতর দিনযাপন করছে। বলা বাহুল্য, মানুষের এ করুণ দশার কারণ আমাদের তথাকথিত জনদরদের রাজনীতি।

কারো জীবনের এতটুকু নিরাপত্তা নেই। কে কখন কোথায় আন্দোলনের আগুনে পুড়ে অঙ্গার হবে, চলন্ত গাড়িতে ইটের আঘাতে মৃত্যুমুখে পড়বে-সে চিন্তায় মলিন কর্মজীবী মানুষের মুখ। হরতাল-অবরোধে বন্ধ হবার উপক্রম খেটে খাওয়া মানুষের রুটি-রুজির পথ।

নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে চলছে ১৮ দলীয় জোটের হরতাল কর্মসূচি। তৃতীয় দফায় ৮৪ ঘণ্টার হরতালে সারা দেশে ৫-৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত শতাধিক। এসময়ে শুধু রাজধানীতেই পিকেটারদের আগুনে দগ্ধ হয়েছে অন্তত ২৫ জন। এর আগের দফার হরতালে গাজীপুরে অগ্নিদগ্ধ কিশোর মনিরের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্বের হরতালে মনিরের পথযাত্রী হতে চলেছেন মন্টু পালসহ আরও কয়েকজন। চির অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে তাদের দরিদ্র পরিবারগুলো। কিন্তু এখনও যেহেতু ‘জনগণের স্বার্থ’ উদ্ধার হয়নি, তাই বিরোধী দলীয় জোটের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। সমানতালে চলবে সহিংসতাও।

মানুষের এ করুণ দশায় অবশ্য খুবই ব্যথিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কয়েক দিন আগে আলেম-ওলামাদের এক সমাবেশে তিনি এ ব্যাপারে তার উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে আবেগভরা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আপনারা বিশ্বাস করুন, পুড়িয়ে মানুষ হত্যার ঘটনা আমি সহ্য করতে পারি না। আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, দেশের মানুষের শান্তি চাই।’

শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীত্ব না চাইলেও তিনি এ পদ ছাড়তেও রাজি হচ্ছেন না। কারণ সংবিধান অনুযায়ী তার অধীনেই আগামী নির্বাচনের পথ নিষ্কণ্টক রাখা হয়েছে। আর তা তারা করেছেন সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে। কাজেই বিএনপির ‘অন্যায় আবদারে’ তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে যাবেন কেন!

গাড়ি ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো যে হরতাল সমর্থকরা ঘটাবে সেটাই যৌক্তিক। আরও যৌক্তিক বিষয় হলো এসব কর্মকাণ্ডে বিরোধীদলের প্রতি জনগণ বিক্ষুদ্ধ হচ্ছে। কাজেই বিরোধী দলের আন্দোলন কর্মসূচি চলাকালে এ ধরনের ঘটনা যে-ই ঘটাক দায় ১৮ দলীয় জোটের ঘাড়েই পড়বে। ফলে সরকারদলীয় লোকজনের বিরুদ্ধে ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানোর জন্য বিভিন্নস্থানে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের যে অভিযোগ উঠছে তাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তদন্ত করলে প্রকৃত বিষয়টি বেরিয়ে আসবে।

উদ্ভুত সঙ্কট নিরসনে দেশী-বিদেশি নানা উদ্যোগও আমরা ভেস্তে যেতে দেখছি। নিজেদের অবস্থান থেকে এক চুলও না নড়ার ঘোষণা যেমন ক্ষমতাসীনরা দিয়েছেন, তেমনি বিরোধী জোটও তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বে না।

বস্তুত, স্বার্থের রাজনীতির নির্মম শিকার হচ্ছে নিরীহ মানুষ। যারা ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারার অংশীদার নয়। কাজেই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন থেকে মুক্তি পেতে হলে জনগণকেই সচেতন হতে হবে। এভাবে চলতে পারে না।

সরকার ও বিরোধী জোট উভয়ের কাছে আমাদের অনুরোধ, দয়া করে জনগণকে আর বলির পাঠা করবেন না। দরিদ্র পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষগুলোকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেবেন না। জনগণকে জিম্মি করে নয়, ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারার বিকল্প পথ আপনারা বের করুন। তাতে খেটে খাওয়া মানুষের কোনো আপত্তি থাকবে না। দয়া করে জনগণকে একটু রেহাই দিন।